বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতি ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর: কোয়াড বনাম চীনের কৌশলগত দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের নতুন কূটনীতি
বঙ্গোপসাগরের নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। প্রায় ২২ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই সাগরের তলদেশে লুকিয়ে থাকা বিপুল জ্বালানি সম্পদ এবং এর কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পরাশক্তিগুলোর দৃষ্টি সর্বদা এর ওপর নিবদ্ধ। বাংলাদেশের মহেশখালীর মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে বর্তমানে যে ভূরাজনৈতিক খেলা আবর্তিত হচ্ছে, তা কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের এক মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সোনাদিয়ার ভুল থেকে মাতারবাড়ির উত্থান: চীনের সুযোগ হারানো
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে ভূরাজনীতিতে শুরুতে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল চীন। চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নের পাশাপাশি কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে বাংলাদেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল বেইজিং। ২০১২ সালে আইন পাস এবং ২০১৪ সালে সমঝোতার পথে এগোলেও শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের কিয়াকফিউ (Kyaukpyu) বন্দরকে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় সোনাদিয়া প্রকল্প থেকে সরে আসে সরকার। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সোনাদিয়ার সুযোগ হেলায় হারিয়ে চীন নিজেই নিজের কৌশলগত ক্ষতি ডেকে আনে। এর ফলে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটো বন্দরের 'ঋণের ফাঁদ' কূটনীতির আতঙ্ক কাটিয়ে বাংলাদেশ বিকল্প হিসেবে জাপানের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
জাপানের নতুন প্রস্তাব এবং ভারতের 'সেভেন সিস্টার্স' সংযোগ
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (JICA) অর্থায়নে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে চলেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে বর্তমান ভূরাজনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে জাপানের একটি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। আগামী ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে সামনে রেখে টোকিও নতুন এক বাণিজ্যিক মডেলের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে।
জাপান চায় মাতারবাড়ি বন্দরকে শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, উত্তর-পূর্ব ভারতের 'সেভেন সিস্টার্স' রাজ্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত করতে। এর জন্য একটি 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন' বা শিল্প মূল্য শৃঙ্খল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ব্যাংকক মডেলের আদলে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে কাজ করবে। ত্রিপুরার সাবরুমের সঙ্গে মাতারবাড়ির মাত্র ১৮০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ফোর-লেন হাইওয়ে ও রেল সংযোগ স্থাপন করা গেলে তা পুরো অঞ্চলের বাণিজ্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
কোয়াডের কৌশল ও চীনের 'স্ট্রিং অফ পার্লস' বনাম মাতারবাড়ি
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর কেবল অর্থনৈতিক হাব নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারতের গড়া কৌশলগত জোট কোয়াড -এর জন্য বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব মোকাবেলার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। চীন যখন 'স্ট্রিং অফ পার্লস' নীতির অংশ হিসেবে পাকিস্তানের গোয়াদর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটো এবং মিয়ানমারের কিয়াকফিউ বন্দর দিয়ে ভারতকে ঘিরে ফেলার কৌশল নিয়েছে, তখন মাতারবাড়িতে কোয়াডের এই শক্ত অবস্থান বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-কে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জাপান-ভারত-বাংলাদেশের ত্রিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্ক ও 'সেপা' (CEPA) চুক্তি বাস্তবায়িত হলে নেপাল, ভুটান এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বাণিজ্য চীনের প্রভাব বলয় এড়িয়ে সরাসরি মাতারবাড়িমুখী হতে পারে।
বাংলাদেশের উভয়সংকট ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় অংকের বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আর্থিক সহায়তা বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে জাপানের শর্তযুক্ত এই বিশাল অবকাঠামোগত প্রস্তাব গ্রহণ করলে একদিকে যেমন পরাশক্তি চীন ও পাকিস্তান নাখোস হতে পারে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারতের কৌশলগত চাপের মুখে পড়তে হবে দেশকে। বিগত সরকারের আমলে ভারসাম্যমূলক কূটনীতির চেষ্টা থাকলেও বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বন্ধুরাষ্ট্র চীনকে অসন্তুষ্ট না করে পরাশক্তিগুলোর এই জটিল ও বহুমুখী সমীকরণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কীভাবে সামলান, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম বিপর্যয়: রাজনৈতিক ছায়া নাকি প্রশাসনিক খামখেয়ালিপনা?
ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনার বার্তা: বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রত্যাবর্তন ও কূটনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত?
ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন থিংক ট্যাঙ্কের আয়োজনে শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের ভার্চুয়াল উপস্থিতি: একটি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ