বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

জাতিসংঘের বারান্দায় মহাতামাশা: 'সাইড ইভেন্ট' নাকি ক্রাইম সিন্ডিকেটের এক্সিবিশন?

লিখেছেন: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৮ এএম
জাতিসংঘের বারান্দায় মহাতামাশা: 'সাইড ইভেন্ট' নাকি ক্রাইম সিন্ডিকেটের এক্সিবিশন?

জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চ—যে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববাসী অন্তত খানিকটা গাম্ভীর্য ও পবিত্রতার চোখে দেখতে অভ্যস্ত, সেখানেই যেন মঞ্চস্থ হলো এক অভূতপূর্ব নাটক। দেশের হাইকোর্ট যে ব্যক্তিকে স্পষ্ট ভাষায় ৬৬৬ কোটি টাকার কর ফাঁকি দেওয়ার অপরাধে দায়বদ্ধ করলেন এবং যাঁর সমস্ত রিট খারিজ হয়ে গেল, সেই 'ট্যাক্স অফেন্ডার'কে সাথে নিয়ে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ঘুরে বেড়ালেন খলিল। তাও আবার সাধারণ কোনো নাগরিক হিসেবে নয়, বরং সরকারি ক্ষমতার তোড়ে নিজস্ব এজেন্ডার শো-অফ ও হাততালি কুড়ানোর বিশাল এক কসরত। জাতিসংঘের সাইড ইভেন্টগুলোকে ব্যবহার করে বিশ্বের বাঘা বাঘা 'ভেস্টেড ইন্টারেস্ট' গ্রুপগুলোর মতো রাষ্ট্রীয় খরচে এই যে সেলফি আর করতালির এক্সিবিশন হলো, এতে কি সত্যিই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হলো, নাকি কোটি কোটি মানুষের মাথা হেট হয়ে গেল?

৬৬৬ কোটির কর ফাঁকি: 'সম্মানিত' ক্রিমিনালদের পদচারণায় ফিকে দেশের নৈতিকতা

২০১২ থেকে ২০১৫—বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা কোটি কোটি টাকার কর ফাঁকির রায় এসেছে খোদ দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে। সাধারণ পরিভাষায় একে বলা যায় এক বিশাল ফাইনান্সিয়াল অফেন্স। অথচ সেই অপরাধ ঢাকতে কী দারুণ আয়োজন! যে দেশে ৫ হাজার টাকা কৃষিঋণ শোধ করতে না পারলে নিরীহ কৃষকের হাল-গরু ক্রোক হয়ে যায়, ভাত চুরি কিংবা ২০০ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে তরুণদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়; ঠিক সেই দেশেই ৬৬৬ কোটি টাকা মার দেওয়া রাঘববোয়ালরা দামি স্যুট-টাই পরে বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই যে 'দুর্বলের প্রতি খড়্গহস্ত আর ক্ষমতাবানের প্রতি বিনম্র সহনশীলতা'—এই অদ্ভুত জাতীয় ব্যাধি কি আমাদের বিবেককে বিন্দুমাত্র নাড়া দেয় না?

'খলিল-ইউনুস-লামিয়া' ত্রয়ী এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার চরম ব্যর্থতা

যেকোনো পেশাদার ক্রাইম সিন্ডিকেটে নাকি একজন নারী সদস্য থাকলে পুরো গ্যাংটি 'রাউন্ডেড' বা সুসংগঠিত রূপ পায়—হলিউডের সিনেমাগুলোতে এমন দৃশ্য অহরহ দেখা যায়। জাতিসংঘের করিডোরে খলিল, ইউনুস ও লামিয়ার এই ত্রিপক্ষীয় বিচরণ দেখে কি সেই পুরোনো সিনেমার কথাই মনে পড়ে না? তবে ব্যঙ্গ ও কৌতুকের আড়ালে আসল সত্যটি কিন্তু অত্যন্ত নিষ্ঠুর। দেশের একজন আমজনতার মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—মার্কিন কিংবা পশ্চিমা কোনো রাষ্ট্রপ্রধান কি তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুমতি দিতেন এমন কোটি কোটি ডলারের ট্যাক্স অফেন্ডারকে নিয়ে জাতিসংঘের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় দরবার বসাতে? খলিলের ক্ষমতার সামনে নাকি খোদ তারেক রহমানও আজ চরম অসহায়! এই পুরো ক্ষমতার সমীকরণে মূল ধারার রাজনীতিকরা যেভাবে মাথানত করে আছেন, তা দেখে আজ সত্যিই করুণা হয়।

জনগণের পেটে লাথি, অথচ রাষ্ট্রীয় খরচে ওয়াশিংটন ও নিউ ইয়র্কের আনন্দভ্রমণ!

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে ৭ শতাংশ থেকে ধসে মাত্র ২.২ শতাংশে এসে ঠেকেছে, যেখানে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি ২০-২৫ টাকা বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তোলা হচ্ছে; ঠিক সেই মুহূর্তে কার টাকায় এই বিদেশি নাগরিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর তাঁর দলবলের বিলাসী নিউ ইয়র্ক যাত্রা? সাধারণ জনগণের রক্তপানি করা ট্যাক্সের টাকায় কি এই 'পাওয়ার এক্সিবিশন' আর রাজনৈতিক গোপন আঁতাত চলে? জবাবদিহিতার ন্যুনতম তোয়াক্কা না করে বিবেককে শিকেয় তুলে দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই হরিলুট কেবল কোনো সাধারণ ভুল নয়, এটি পুরো জাতির গালে এক প্রকাণ্ড চপেটাঘাত।

ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে...

হায় রে আমার রূপসী বাংলা! যে সোনার বাংলার স্বপ্নে আমরা বিভোর ছিলাম, যেখানে অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে বজ্রপাতের মতো হুঙ্কার ওঠার কথা ছিল, সেই দেশ আজ শোষক আর ট্যাক্স-ফাঁকিদাতাদের চারণভূমি। কবির ভাষায় হয়তো আজ আবার বলতে ইচ্ছে করে— “কোথা সে তোর দরিদ্র বেশ, কোথা সে তোর মলিন হাসি... আকাশে আজ ছড়িয়ে গেল ওই চরণের দীপ্তি রাশি!” কিন্তু আফসোস, সেই মুক্তিকামী রূপ আজ হারিয়ে গেছে ক্ষমতার লোভে অন্ধ একদল মানুষের স্বার্থপরতার আড়ালে। যতক্ষণ না দেশের ২০ কোটি মানুষ এই হাজার কোটি টাকার রাঘববোয়ালদের প্রতি অন্যায্য সহনশীলতা ভেঙে রুখে দাঁড়াবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই দুর্ভাগা জাতির কপালে জাতিসংঘের করিডোরে বসে অপমানিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই জোটবে না।

লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক