সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

বই নিষিদ্ধের আড়ালে কোন পাপ? বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ না পড়ার নির্মম পরিণতি।

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:১৪ পিএম
বই নিষিদ্ধের আড়ালে কোন পাপ? বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ না পড়ার নির্মম পরিণতি।

যে জাতির নিজের শ্রেষ্ট সন্তানদের রক্তে ভেজা ইতিহাস আর আত্মজীবনীর পাতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় হয় না, সে জাতির পতন অনিবার্য। আজ বাংলাদেশের প্রকাশনা বাজার থেকে শুরু করে বইয়ের বিপণন কেন্দ্রগুলোতে যে অঘোষিত আতঙ্ক আর সেন্সরশিপের দেয়াল তোলা হয়েছে, তার নির্মম বলি হচ্ছে বাঙালির ইতিহাসের এক অমর দলিল—বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। প্রকাশকদের ওপর হামলা, বই বিক্রি বন্ধে হুমকি এবং মব জাস্টিসের এই উল্লাস দেখে আজ বুক কেঁপে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই বইটিকে ভয় পাওয়ার কারণ কী? কে বা কারা আড়াল করতে চাইছে এই পৃষ্ঠাগুলো?

বাস্তবতা বড়োই নির্মম। গত কয়েক বছর ধরে রাজনীতির সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে। দখলবাজি, চাঁদাবাজি আর ক্ষমতার লোভ আজ নীতিকে গ্রাস করেছে। তথাকথিত মন্ত্রী-নেতারা যদি এই আত্মজীবনীটি মন দিয়ে পড়তেন, তবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাথরুমে লুকিয়ে থাকা বা কচুরিপানায় নাক ডুবিয়ে পালানোর মতো লজ্জাজনক অধ্যায়ের জন্ম হতো না। কারণ, বঙ্গবন্ধুর রক্তে ছিল আদর্শ, আর তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল জেল, জুলুম ও মৃত্যুকে উপেক্ষা করার এক অনন্য মহাকাব্য। সেখানে কোনো পলায়নপরতা ছিল না।

এই আত্মজীবনী কেবল একটি বই নয়, এটি একজন মানুষের তিলতিল করে গড়ে ওঠা দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি। এই বই বাজারে থাকলে, তরুণ প্রজন্ম বা নতুন রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশ হয়তো মব ভায়োলেন্স ও চাঁদাবাজির অন্ধকার পথ ছেড়ে সত্যিকারের দেশপ্রেমে দীক্ষিত হয়ে যেত। আর ঠিক এখানেই হলো যত ভয়!

বেকারত্বে জর্জরিত এই সমাজে আজ চাঁদাবাজি একটি অত্যন্ত লাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলে মুখ বদলায়, কিন্তু লুটপাটের চরিত্র বদলায় না। বিশ শতকের ছাত্রনেতারা যেখানে গণমানুষের অধিকার আদায়ে বাসে-লঞ্চে ঘুরে বেড়িয়েছেন, সেখানে আজকের তথাকথিত বিপ্লবীদের কোটি টাকার গাড়িতে চড়ার বিলাসী জীবন আর ফাইভ স্টার হোটেলের সংস্কৃতি প্রমাণ করে তারা ইতিহাস থেকে কতটা দূরে। এই আত্মজীবনী মানুষের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শেখায়। বইটা যদি ঘরে ঘরে পড়া হতো, তবে মানুষ নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন তুলত—তখন আর রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া যায় না। তাই তো আজ বই বিক্রি বন্ধ করার এই অপচেষ্টা এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। এই সমাজ তার মহান নায়কদের বারবার বঞ্চিত করেছে, উপেক্ষায় সিক্ত করেছে। কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে নেতাজীর বাড়িকে ‘ওদের বাড়ি’ বলার মতো আত্মবিস্মৃত মানসিকতা কিংবা নিজের শিকড়কে অস্বীকার করার এই প্রবণতা আমাদের চিরকালের অভিশাপ। , ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রি বন্ধের এই হামলা হয়তো সাময়িকভাবে ফায়দা লুটতে পারে। কারণ, এই বই মানুষের মনের লোভ আর অন্ধ ক্ষমতার মোহকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। বিবেক জাগ্রত হলে যে লুটপাটের রাজত্ব টিকে থাকে না, তা লুটেরারা ভালো করেই জানে। তাই আত্মজীবনী বন্ধ রাখার এই অন্ধ উদ্যোগ আদতে একটি পচে যাওয়া ব্যবস্থারই দীর্ঘশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: