সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

শেখ হাসিনার ফেরা ও জনমতের প্রশ্ন: সত্যের সন্ধানে

লিখেছেন: নীহারিকা রায়, উন্নয়নকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৪ এএম
শেখ হাসিনার ফেরা ও জনমতের প্রশ্ন: সত্যের সন্ধানে

গত কিছু দিন ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ইচ্ছা বা সম্ভাবনার বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সাধারণ শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের মুখেও কথাটি শোনা যাচ্ছে যে, দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে তাঁর দেশে ফেরা উচিত। এই আলোচনার রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য যেমনই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়—সারা দেশের প্রকৃত জনমত আসলে কী? আর কোন উপায়ে জনমতের সত্যতার সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব?

জরিপের সীমাবদ্ধতা

যেকোনো দেশেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনমত পরিমাপ করতে সাধারণত বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা বা গণমাধ্যমের জরিপের ওপর নির্ভর করা হয়। তবে অধিকাংশ জরিপই তৈরি হয় মাত্র কয়েক হাজার মানুষের মতামতের ওপর ভিত্তি করে। স্বভাবতই সেই জরিপের ফলাফল দেখে কখনো আমরা অতিরিক্ত আশাবাদী হই, আবার কখনো চরম হতাশ হই।

জরিপ পদ্ধতির কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে:

স্বার্থের দ্বন্দ্ব: জরিপকারী সংস্থা কিংবা মাঠকর্মীদের নিজস্ব রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি বা স্বার্থ থাকতে পারে, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ: সাধারণ মানুষ অনেক সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে মনের কথা বলে না। ফলে জরিপে প্রাপ্ত মতামত সবসময় তাঁদের প্রকৃত বিশ্বাসের প্রতিফলন নাও হতে পারে।

একটি বৈজ্ঞানিক ও সুষ্ঠু জরিপ থেকে জনমতের কিছুটা স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায় সত্য, কিন্তু ব্যালট বাক্সে সেই জরিপের প্রতিফলন সবসময় হুবহু মেলে না।

গণভোটের শক্তি ও বিশ্বস্ততা

জনমত পরিমাপের সবচেয়ে বিস্তৃত ও শক্তিশালী মাধ্যম হলো গণভোট বা সর্বজনীন নির্বাচন, যেখানে দেশের কোটি কোটি যোগ্য নাগরিক সরাসরি তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন গণভোটের বড় বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

এটি নির্বাচন কমিশন বা নির্দিষ্ট কোনো আইনি কাঠামোর অধীনে কঠোর নিরাপত্তায় পরিচালিত হয়। প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হলে এতে জালিয়াতি বা পক্ষপাতের সুযোগ বেশ কম থাকে। এই ফলাফলের আইনি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকে, যা রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। অপরদিকে কোনো বেসরকারি সংস্থার জরিপ কেবল একটি প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে, যার কোনো আইনি শক্তি নেই।

বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ও সামাজিক মহলে জনমত নিয়ে নানা দৃষ্টিভঙ্গি দৃশ্যমান। সরকারপন্থী মহলের একটি অংশ এবং বিরোধী ধারার বিভিন্ন শক্তির দাবি—দেশের আপামর জনগণ শেখ হাসিনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাঁদের মতে, তাঁর পক্ষে দেশে ফেরা রাজনৈতিকভাবে সমীচীন নয় এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাধারণত কয়েকটি প্রধান কারণে একটি সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয় এবং জনমত বিপক্ষে চলে যায়-

• দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার • অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি • বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের সংকোচন • সুষ্ঠু নির্বাচনের অভাব • বেকারত্ব এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া • নাগরিক সুবিধা ও উন্নয়নের ঘাটতি

মন্ত্রী, সংসদের স্পিকার ও গণমাধ্যমের বক্তব্য থেকে জানা যায়, প্রশাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় দুর্নীতি বেড়েছে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোগ হচ্ছে না।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ আছে। বলা হচ্ছে, ভিন্নমত দমনে সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে এবং সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা কারাগারে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ। একটি বড় দল ও তার জোটসঙ্গীদের বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক ছিল না। ফলে মানুষ নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নিতে পারেনি। নতুন কর্মসংস্থানের অভাব এবং যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় তরুণ সমাজের বড় অংশ হতাশ ও ক্ষুব্ধ।

রাজনীতি বিশ্লেষক ও অভিজ্ঞ মহলের মতে, নিত্যপণ্যের বাজার ব্যবস্থার অস্থিরতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির মতো মৌলিক সেবার মূল্যবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সঙ্কোচনের ফলে সাধারণ জীবনযাত্রার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি, যেকোনো সময় নির্বাচনে সব পক্ষের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হলে গণমানুষের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাহত হয়।

ভোটের ইতিহাস ও গণজোয়ারের অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের নির্বাচন কেন্দ্রিক ইতিহাসে জনমতের গতিপ্রকৃতি সবসময় একটি সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশ করে।

২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচন: আওয়ামী লীগের তীব্র সমালোচকরাও সাধারণত ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে উদাহরণ দেন। সেই নির্বাচনে মহাজোট প্রায় ৫৭ শতাংশ ভোট পায়, যার মধ্যে আওয়ামী লীগ এককভাবে লাভ করেছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট।

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন: আরও অতীতে নজর দিলে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৭৪.৯ শতাংশ পেয়ে নিরঙ্কুশ জয় অর্জন করে। জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই জয়লাভ করে দলটিকে বিপুল জনসমর্থনের চূড়ায় নিয়ে যায়।

বর্তমানে সমাজ ও রাজনীতির প্রবীণ অংশটির অনেকে বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগের সামাজিক আবেগ বা এক ধরনের জনজোয়ারের পূর্বাভাস দেখতে পান। তাঁদের মতে, সাধারণ মানুষের এই অন্তর্নিহিত মনোভাব রাজনৈতিক মহল ও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তথ্যাদির মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে বলেই হয়তো রাজনৈতিক বিতর্কের তীব্রতা এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোনো জরিপ কেবল একটি ধারণা দেয়, আর জনপরিসরে চায়ের দোকানের আলোচনা দেয় একটি খণ্ডচিত্র। কিন্তু জনতার আসল ও চূড়ান্ত রায় জানার সবচেয়ে নিরপেক্ষ, বৈধ ও বিশ্বস্ত মাধ্যম একটিই—একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।

গণতান্ত্রিক নীতি অনুযায়ী জনমতকে ভয় না পেয়ে, সব রাজনৈতিক দলকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সমান সুযোগ দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করাই দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের প্রধান শর্ত। আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধার সমতা বজায় রেখে জনগণের আদালত বা ভোটাধিকারের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত ঠিক হওয়া উচিত জনমতের প্রকৃত রূপ কী। তাই শেখ হাসিনা ফিরবেন, জনমত যাচাই করবেন।

নীহারিকা রায়, উন্নয়নকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

…..

শেখ হাসিনার ফেরা ও জনমতের প্রশ্ন: সত্যের সন্ধানে

গত কিছু দিন ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ইচ্ছা বা সম্ভাবনার বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সাধারণ শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের মুখেও কথাটি শোনা যাচ্ছে যে, দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে তাঁর দেশে ফেরা উচিত। এই আলোচনার রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য যেমনই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়—সারা দেশের প্রকৃত জনমত আসলে কী? আর কোন উপায়ে জনমতের সত্যতার সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব?

জরিপের সীমাবদ্ধতা

যেকোনো দেশেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনমত পরিমাপ করতে সাধারণত বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা বা গণমাধ্যমের জরিপের ওপর নির্ভর করা হয়। তবে অধিকাংশ জরিপই তৈরি হয় মাত্র কয়েক হাজার মানুষের মতামতের ওপর ভিত্তি করে। স্বভাবতই সেই জরিপের ফলাফল দেখে কখনো আমরা অতিরিক্ত আশাবাদী হই, আবার কখনো চরম হতাশ হই।

জরিপ পদ্ধতির কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে:

স্বার্থের দ্বন্দ্ব: জরিপকারী সংস্থা কিংবা মাঠকর্মীদের নিজস্ব রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি বা স্বার্থ থাকতে পারে, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ: সাধারণ মানুষ অনেক সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে মনের কথা বলে না। ফলে জরিপে প্রাপ্ত মতামত সবসময় তাঁদের প্রকৃত বিশ্বাসের প্রতিফলন নাও হতে পারে।

একটি বৈজ্ঞানিক ও সুষ্ঠু জরিপ থেকে জনমতের কিছুটা স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায় সত্য, কিন্তু ব্যালট বাক্সে সেই জরিপের প্রতিফলন সবসময় হুবহু মেলে না।

গণভোটের শক্তি ও বিশ্বস্ততা

জনমত পরিমাপের সবচেয়ে বিস্তৃত ও শক্তিশালী মাধ্যম হলো গণভোট বা সর্বজনীন নির্বাচন, যেখানে দেশের কোটি কোটি যোগ্য নাগরিক সরাসরি তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন গণভোটের বড় বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

এটি নির্বাচন কমিশন বা নির্দিষ্ট কোনো আইনি কাঠামোর অধীনে কঠোর নিরাপত্তায় পরিচালিত হয়। প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হলে এতে জালিয়াতি বা পক্ষপাতের সুযোগ বেশ কম থাকে। এই ফলাফলের আইনি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকে, যা রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। অপরদিকে কোনো বেসরকারি সংস্থার জরিপ কেবল একটি প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে, যার কোনো আইনি শক্তি নেই।

বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ও সামাজিক মহলে জনমত নিয়ে নানা দৃষ্টিভঙ্গি দৃশ্যমান। সরকারপন্থী মহলের একটি অংশ এবং বিরোধী ধারার বিভিন্ন শক্তির দাবি—দেশের আপামর জনগণ শেখ হাসিনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাঁদের মতে, তাঁর পক্ষে দেশে ফেরা রাজনৈতিকভাবে সমীচীন নয় এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাধারণত কয়েকটি প্রধান কারণে একটি সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয় এবং জনমত বিপক্ষে চলে যায়-

• দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার • অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি • বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের সংকোচন • সুষ্ঠু নির্বাচনের অভাব • বেকারত্ব এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া • নাগরিক সুবিধা ও উন্নয়নের ঘাটতি

মন্ত্রী, সংসদের স্পিকার ও গণমাধ্যমের বক্তব্য থেকে জানা যায়, প্রশাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় দুর্নীতি বেড়েছে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোগ হচ্ছে না।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ আছে। বলা হচ্ছে, ভিন্নমত দমনে সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে এবং সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা কারাগারে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ। একটি বড় দল ও তার জোটসঙ্গীদের বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক ছিল না। ফলে মানুষ নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নিতে পারেনি। নতুন কর্মসংস্থানের অভাব এবং যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় তরুণ সমাজের বড় অংশ হতাশ ও ক্ষুব্ধ।

রাজনীতি বিশ্লেষক ও অভিজ্ঞ মহলের মতে, নিত্যপণ্যের বাজার ব্যবস্থার অস্থিরতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির মতো মৌলিক সেবার মূল্যবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সঙ্কোচনের ফলে সাধারণ জীবনযাত্রার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি, যেকোনো সময় নির্বাচনে সব পক্ষের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হলে গণমানুষের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাহত হয়।

ভোটের ইতিহাস ও গণজোয়ারের অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের নির্বাচন কেন্দ্রিক ইতিহাসে জনমতের গতিপ্রকৃতি সবসময় একটি সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশ করে।

২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচন: আওয়ামী লীগের তীব্র সমালোচকরাও সাধারণত ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে উদাহরণ দেন। সেই নির্বাচনে মহাজোট প্রায় ৫৭ শতাংশ ভোট পায়, যার মধ্যে আওয়ামী লীগ এককভাবে লাভ করেছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট।

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন: আরও অতীতে নজর দিলে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৭৪.৯ শতাংশ পেয়ে নিরঙ্কুশ জয় অর্জন করে। জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই জয়লাভ করে দলটিকে বিপুল জনসমর্থনের চূড়ায় নিয়ে যায়।

বর্তমানে সমাজ ও রাজনীতির প্রবীণ অংশটির অনেকে বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগের সামাজিক আবেগ বা এক ধরনের জনজোয়ারের পূর্বাভাস দেখতে পান। তাঁদের মতে, সাধারণ মানুষের এই অন্তর্নিহিত মনোভাব রাজনৈতিক মহল ও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তথ্যাদির মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে বলেই হয়তো রাজনৈতিক বিতর্কের তীব্রতা এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোনো জরিপ কেবল একটি ধারণা দেয়, আর জনপরিসরে চায়ের দোকানের আলোচনা দেয় একটি খণ্ডচিত্র। কিন্তু জনতার আসল ও চূড়ান্ত রায় জানার সবচেয়ে নিরপেক্ষ, বৈধ ও বিশ্বস্ত মাধ্যম একটিই—একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।

গণতান্ত্রিক নীতি অনুযায়ী জনমতকে ভয় না পেয়ে, সব রাজনৈতিক দলকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সমান সুযোগ দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করাই দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের প্রধান শর্ত। আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধার সমতা বজায় রেখে জনগণের আদালত বা ভোটাধিকারের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত ঠিক হওয়া উচিত জনমতের প্রকৃত রূপ কী। তাই শেখ হাসিনা ফিরবেন, জনমত যাচাই করবেন।

নীহারিকা রায়, উন্নয়নকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট