সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

শাপলা চত্বরে ‘হত্যাকাণ্ড’ হয়েছিল কি? ১৩ বছর পর ৪১ জনের বিচার ঘিরে নতুন প্রশ্ন

লিখেছেন: দ্য সোর্স নিউজ বাংলা | অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
শাপলা চত্বরে ‘হত্যাকাণ্ড’ হয়েছিল কি? ১৩ বছর পর ৪১ জনের বিচার ঘিরে নতুন প্রশ্ন

২০১৩ সালের ৫ মে রাতে ঢাকার শাপলা চত্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিপুলসংখ্যক হেফাজতকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল—এক যুগের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন একটি বয়ান প্রচলিত রয়েছে। কখনো শত শত, এমনকি হাজারো মানুষ হত্যার দাবিও করা হয়েছে।

কিন্তু সেদিন ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী সময়ে সামনে আসা তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের দিকে ইঙ্গিত করে: ৫ ও ৬ মে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটেছিল; কিন্তু সেই মৃত্যুগুলো এবং গভীর রাতে শাপলা চত্বর খালি করার অভিযান একই ঘটনা নয়।

সাবেক BBC Bangla প্রধান সাবির মুস্তফা বলেছেন, শাপলা চত্বর খালি করার রাতের অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটার প্রমাণ BBC-এর সাংবাদিকেরা পাননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, BBC সাংবাদিক কাদির কল্লোল ওই রাতে ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং লন্ডন থেকে তাঁর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হয়েছিল। তিনি সেখানে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যার দৃশ্য, অভিযানে নিহত মানুষের মৃতদেহ কিংবা রাস্তায় রক্ত দেখতে পাননি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ৫–৬ মে কোনো মানুষ মারা যায়নি। সেদিন ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে এবং পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যত্র হেফাজতকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্যদের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটেছিল।

এই পার্থক্যটি এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঘটনার ১৩ বছর পর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—যে ঘটনাকে বছরের পর বছর ‘শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড’ বলা হয়েছে, শাপলা চত্বর খালি করার সেই নির্দিষ্ট রাতের অভিযানে হত্যার প্রমাণ কী? আর দিনের বেলা ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে সংঘর্ষে হওয়া মৃত্যুগুলোকে কি রাতের অভিযানের সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে?

৫ মে: সমাবেশ থেকে সহিংসতা

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম তাদের ১৩ দফা দাবিতে ঢাকায় বড় ধরনের সমাবেশ করে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংগঠনটির সমর্থক ঢাকায় আসেন।

দিনের একপর্যায়ে পল্টন, মতিঝিল, বায়তুল মোকাররমসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। গাছ কাটা, দোকান ও বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়া, সড়কের অবকাঠামো ভাঙচুর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সে সময়কার প্রধান বিরোধী দল বিএনপি হেফাজতের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। সরবরাহ করা নথিতে বলা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলীয় নেতাকর্মীদের হেফাজতের কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সেদিন ঢাকা এবং পরে দেশের আরও কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটে।

কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক বয়ানে একটি ভিন্ন দাবি শক্তিশালী হয়ে ওঠে—গভীর রাতে শাপলা চত্বর খালি করার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। এই নির্দিষ্ট দাবিটির প্রমাণ নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।

BBC-এর সাংবাদিক ছিলেন ঘটনাস্থলে

সাবির মুস্তফা দীর্ঘ সময় BBC বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন। শাপলা চত্বরের ঘটনার রাতে তিনি লন্ডনে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, BBC সাংবাদিক কাদির কল্লোল গভীর রাত পর্যন্ত শাপলা চত্বরে ছিলেন এবং লন্ডন থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছিল।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন শত শত মানুষ নিহত, মৃতদেহ ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া এবং রক্ত ধুয়ে ফেলার মতো ভয়াবহ সব খবর ছড়িয়ে পড়ছিল।

সাবির মুস্তফার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব দাবি ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকের কাছে বারবার পরিস্থিতি জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তিনি সেখানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের কোনো দৃশ্য দেখতে পাননি।

সাবির মুস্তফা একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করেছেন—৫ ও ৬ মে বিভিন্ন সংঘর্ষে মানুষ মারা গেছে এবং BBC সেসব মৃত্যুর খবরও প্রচার করেছে।

অর্থাৎ, প্রশ্নটি “সেদিন কেউ মারা গিয়েছিল কি না”—সেটি নয়।

প্রশ্নটি হলো—শাপলা চত্বর খালি করার রাতের অভিযানে মানুষ হত্যা করা হয়েছিল কি না।

শাপলা চত্বরে মৃতদেহ থাকলেই সেখানে হত্যা হয়েছিল?

এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।

ঘটনার দিনের বিভিন্ন সংঘর্ষে নিহত কয়েকজনের মৃতদেহ শাপলা চত্বরের সমাবেশস্থলে নিয়ে আসা হয়েছিল বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দ্য সোর্স নিউজ বাংলাকে সরবরাহ করা নথিতেও চার ব্যক্তির মৃতদেহ অন্য স্থান থেকে সমাবেশস্থলে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে।

Human Rights Watch-ও ২০১৩ সালের অনুসন্ধানে দিনের বেলা নিহত কয়েকজনের মৃতদেহ শাপলা চত্বরে নিয়ে আসার তথ্য উল্লেখ করেছিল।

ফলে শাপলা চত্বরে কোনো মৃতদেহ পাওয়া বা দেখা যাওয়াই প্রমাণ করে না যে ওই ব্যক্তি গভীর রাতের অভিযানে সেখানে নিহত হয়েছিলেন।

Human Rights Watch অবশ্য ৫–৬ মে সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ করেছিল এবং বিভিন্ন স্থানের সংঘর্ষ মিলিয়ে অন্তত ৫৮ জনের মৃত্যুর হিসাব দিয়েছিল। একই সঙ্গে সংস্থাটি হেফাজতের অনেক বেশি প্রাণহানির দাবিকে অতিরঞ্জিত এবং বিরোধী পক্ষের কিছু দাবিকে অবিশ্বাস্য বলেও উল্লেখ করেছিল।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাগত পার্থক্য প্রয়োজন:

৫–৬ মে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট কতজন মারা গিয়েছিলেন—এটি একটি প্রশ্ন।

আর,

গভীর রাতে শাপলা চত্বর খালি করার মূল অভিযানে কতজন নিহত হয়েছিলেন—এটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন।

দুটিকে এক করে দেখলে ইতিহাস এবং বিচার—দুটিই বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তাহলে ‘শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড’ কথাটি এলো কোথা থেকে?

অভিযানের পরপরই ভয়াবহ সব সংখ্যা ছড়িয়ে পড়ে। শত শত কিংবা হাজারো মানুষ নিহত এবং ট্রাকে করে মৃতদেহ সরিয়ে নেওয়ার মতো দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রচারিত হয়।

কিন্তু একটি এত বড় হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই কিছু মৌলিক প্রশ্ন আসে। নিহত ব্যক্তিরা কারা?

তাঁদের নাম কী? তাঁদের পরিবার কোথায়? হাসপাতাল বা মর্গের নথি কোথায়?

ঘটনাস্থলে তাঁদের নিহত হওয়ার ছবি বা ভিডিও কোথায়?

কোন বাহিনীর গুলিতে তাঁরা মারা গেছেন?

সাবির মুস্তফার বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিকও এখানেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শাপলা চত্বরের রাতের অভিযানে নিহত বলে দাবি করা ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট পরিচয় জানতে চাওয়া হলেও তার বিশ্বাসযোগ্য তালিকা সামনে আসেনি।

এর অর্থ আবারও এই নয় যে সেদিন কোনো প্রাণহানি হয়নি।

এর অর্থ হলো, দিনের সংঘর্ষে হওয়া মৃত্যু এবং গভীর রাতে শাপলা চত্বর খালি করার অভিযানকে আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।

১৩ বছর পর ৪১ জন আসামি

এখন ঘটনার ১৩ বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

আসামিদের তালিকায় সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতা, সাবেক আইজিপি, পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাবেক বিজিবি মহাপরিচালক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা রয়েছেন।

এত বিস্তৃত একটি আসামি তালিকা স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আনে—প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কি আলাদা ও সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ রয়েছে, নাকি তৎকালীন সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রে তাঁদের অবস্থান এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সামষ্টিক দায় আরোপ করা হচ্ছে?

মানবতাবিরোধী অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ। ফলে অভিযোগ যত গুরুতর, প্রমাণের মানও তত শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

বিজিবির ভূমিকা এবং জেনারেল (অব.) আজিজকে আসামি করা

এই প্রশ্ন বোঝার একটি উদাহরণ হতে পারে তৎকালীন বিজিবি মহাপরিচালক জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের বিষয়টি।

৪১ আসামির তালিকায় তিনি ২৬ নম্বরে রয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন।

কিন্তু শাপলা চত্বর খালি করার মূল অভিযানে বিজিবির ভূমিকা নিয়েই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।

দ্য সোর্স নিউজ বাংলাকে সরবরাহ করা নথিতে বলা হয়েছে, ৫ মে রাতে শাপলা চত্বর খালি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পুলিশ সদর দপ্তরের একটি বৈঠকে। মূল অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ, র‌্যাব তাদের সহায়তা করে এবং বিজিবিকে প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়।

নথিটির দাবি, বিজিবি সদস্যরা মূলত সচিবালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বঙ্গভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন এবং শাপলা চত্বর খালি করার মূল অভিযানে অংশ নেননি।

Human Rights Watch-এর ২০১৩ সালের প্রত্যক্ষদর্শীভিত্তিক অনুসন্ধানেও বলা হয়েছিল, বিজিবি সদস্যরা পুলিশ ও র‌্যাবের পেছনে অবস্থান করলেও মূল clearance operation-এ অংশ নেননি।

আর দ্য সোর্স নিউজ বাংলাকে দেওয়া নথির দাবি, শাপলা চত্বর খালি করার পরিকল্পনা-সংক্রান্ত বৈঠকে জেনারেল আজিজ উপস্থিত ছিলেন না এবং ব্যক্তিগতভাবেও অভিযানে অংশ নেননি। আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম অভিযোগ দেওয়ার সময় তাঁর নাম ছিল না; পরবর্তী পর্যায়ে তাঁকে আসামি করা হয়।

এসব দাবি আদালতে প্রমাণ ও পাল্টা প্রমাণের বিষয়। প্রসিকিউশনের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কোনো সাক্ষ্য, নথি, নির্দেশ অথবা command responsibility প্রতিষ্ঠার উপাদান থাকলে সেটিও বিচারপ্রক্রিয়ায় সামনে আসা প্রয়োজন।

বিশেষ করে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে Interpol-এর Red Notice চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এটি শুধু জেনারেল আজিজের প্রশ্ন নয়।

৪১ আসামির প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই দেখাতে হবে—কে কী করেছিলেন, কোন সিদ্ধান্তে অংশ নিয়েছিলেন, কোন নির্দেশ দিয়েছিলেন অথবা কথিত অপরাধ সংঘটনে তাঁর ব্যক্তিগত ভূমিকা কী ছিল।

কোনো বাহিনীর প্রধান হওয়া, কোনো সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করা কিংবা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয়—নিজে অপরাধের প্রমাণ নয়।

ইন্টারপোলও এখন এই বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ

বর্তমান বিএনপি সরকার বিদেশে থাকা সাবেক সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে দেশে ফেরানোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইছে।

সরকার জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত আনার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে Interpol Red Notice চাওয়া হয়েছে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ অন্যদের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধেও Interpol Red Notice জারি হয়েছে এবং তাঁকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ চলছে।

শাপলা চত্বর মামলার ক্ষেত্রেও Interpol-এর সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন—Red Notice কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়।

এটি কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে প্রত্যর্পণ বা সমজাতীয় আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সাময়িকভাবে আটক করার অনুরোধ। সংশ্লিষ্ট দেশ তার নিজস্ব আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আর Interpol-এর সংবিধানের Article 3 অনুযায়ী রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা জাতিগত চরিত্রের কর্মকাণ্ডে সংস্থাটির হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ।

ফলে বাংলাদেশ থেকে আবেদন পাঠানো এবং Interpol সেই আবেদন গ্রহণ করে Red Notice জারি করা এক বিষয় নয়। অভিযোগের আইনগত ও তথ্যগত ভিত্তিও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।

একই দিনের দুই আলাদা ঘটনা শাপলা চত্বর নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি সম্ভবত এখানেই—দুটি সম্পর্কিত কিন্তু আলাদা ঘটনাকে প্রায়ই একটি ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রথমত, ৫ মে দিনের বেলা ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং অন্যদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষ হয়েছিল। পরে দেশের অন্য জায়গাতেও সংঘর্ষ হয়েছে। মানুষ মারা গেছে।

দ্বিতীয়ত, গভীর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাপলা চত্বরে অবস্থানকারীদের সরিয়ে দেয়। প্রথম ঘটনায় প্রাণহানি নথিবদ্ধ।

কিন্তু দ্বিতীয় ঘটনাটিকেই যদি ‘শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড’ বা ‘গণহত্যা’ বলা হয়, তাহলে সেই নির্দিষ্ট অভিযোগের জন্য নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।

কারা সেখানে নিহত হয়েছেন? কতজন? কোথায় তাঁদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে? কার গুলিতে তাঁরা মারা গেছেন? কোন বাহিনী গুলি করেছে? কোন কর্মকর্তা সেই নির্দেশ দিয়েছেন? ১৩ বছর পর মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে বিচার করতে গেলে এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বয়ান বা অনুমানের মাধ্যমে নয়, সাক্ষ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে দিতে হবে। ২০১৩ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ভুলে গেলে চলবে না শাপলা চত্বরের ঘটনাকে সেই সময়ের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন করেও দেখা যায় না। তখন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছিল। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে বড় সামাজিক আন্দোলন তৈরি করেছিল। অন্যদিকে হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামে। নারী-পুরুষের সামাজিক মেলামেশা, ভাস্কর্য, ধর্ম অবমাননার শাস্তিসহ তাদের বেশ কিছু দাবি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। ফলে ৫ মে-র ঘটনাটি শুধু একটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল না; এর পেছনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়, ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মধ্যকার দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনও ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, সেটি অপরাধের প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।

বিচার হোক—ইতিহাসও বিকৃত না হোক

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন। সেই মূল্যবোধের দাবি খুব সরল। কেউ অপরাধ করলে তাঁর বিচার হতে হবে—তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সেনা বা পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক কিংবা রাজনৈতিক নেতা যিনিই হোন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় কখনো অপরাধের বিকল্প প্রমাণ হতে পারে না।

একইভাবে ২০১৩ সালের ৫–৬ মে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকলে সেই মৃত্যুর বিচার অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই প্রাণহানিকে প্রমাণ ছাড়াই গভীর রাতের শাপলা চত্বর অভিযানে সংঘটিত ‘গণহত্যা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাও ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। তেরো বছর পর তাই এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত ৪১ জন আসামির নাম নয়। প্রশ্নটি তারও আগে— শাপলা চত্বরে সেই রাতের অভিযানে আসলে কাকে হত্যা করা হয়েছিল? কারণ রাষ্ট্র যদি ওই রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৪১ জন মানুষের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে চায়, তাহলে এই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য, যাচাইযোগ্য এবং প্রমাণভিত্তিক উত্তর থেকেই বিচার প্রক্রিয়ার শুরু হওয়া উচিত।

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা | অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ