সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

রাতের আঁধারে মানবতার প্রদীপ নিভানোর উল্লাস: মিরপুরের অর্ধশত বছরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বুলডোজার হামলার মর্মান্তিক দলিল

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:৩৩ এএম
রাতের আঁধারে মানবতার প্রদীপ নিভানোর উল্লাস: মিরপুরের অর্ধশত বছরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বুলডোজার হামলার মর্মান্তিক দলিল

শুক্রবারের যে রাতটি অন্য দশটা রাতের মতো শান্ত ও স্বাভাবিক হতে পারত, মিরপুরবাসীর জন্য সেটি হয়ে উঠল এক গভীর কালো অধ্যায়। রাজধানীর মিরপুর-১-এর ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার আজ একরাশ ধ্বংসস্তূপের নাম। প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে যে প্রাঙ্গণটি হাজারো দরিদ্র মা ও শিশুর মুখে হাসি ফুটিয়েছে, বিনামূল্যে জীবনরক্ষাকারী সেবা দিয়েছে, আজ সেটিকে লোভের সাইনবোর্ডে ঢেকে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। মধ্যরাতে দুই শতাধিক মুখোশধারীর নির্মম তণ্ডব শুধু কিছু ইট-কাঠই ভাঙেনি, গুঁড়িয়ে দিয়েছে সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের ভরসার শেষ ঠিকানাটিকেও।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দেশের তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে যতগুলো কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে তুলেছিল, পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এসে সেগুলোকে বন্ধ করে গরুর খোয়াড় ও মাদকসেবীদের আড্ডায় পরিণত করেছিল। ইতিহাস সাক্ষী, জনগণের জীবন নিয়ে খেলা করার সেই পুরনো মানসিকতা আজও পরিবর্তিত হয়নি। পরবর্তীতে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বজনীন ও সহজলভ্য করতে একদিকে যেমন সরকারি বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, অন্যদিকে রাড্ডার মতো জনকল্যাণমূলক বেসরকারি ও অংশীদারিত্বমূলক উদ্যোগগুলোকেও সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হয়েছিল।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কতিপয় সুযোগসন্ধানী চক্র পুনরায় দেশের স্বাস্থ্য খাতকে ধ্বংসের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। একদিকে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের আক্রমণে যখন একের পর এক শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, ঠিক তখনই শহরাঞ্চলের প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার শেষ পথটুকুও এভাবে বলপ্রয়োগ করে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

জিম্মিজীবন আর তছনছ করা স্মৃতির দলিল

দিবাগত রাত ১২টা। চারদিক যখন সুনসান নীরব, ঠিক তখনই রাক্ষুসে উল্লাসে মেতে ওঠে একদল সশস্ত্র মুখোশধারী। ‘সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর ব্যানারে আসা এই ত্রাস সৃষ্টিকারীরা প্রথমে গেটের দায়িত্বে থাকা দুই নিরীহ নিরাপত্তারক্ষীকে জিম্মি করে ভেতরে প্রবেশ করে।

এরপর শুরু হয় নিষ্ঠুর তান্ডব। চিকিৎসালয়ের পবিত্র দেয়ালগুলো সাক্ষী হয়ে রয় এক পৈশাচিক লুটপাটের:

তছনছ চিকিৎসাসেবা: সরকারি ইপিআই টিকা, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ থেকে শুরু করে ল্যাবরেটরির রিএজেন্ট পর্যন্ত সবকিছু সুপরিকল্পিতভাবে নষ্ট করা হয়।

মূল্যবান সম্পদ লুণ্ঠন: প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, এসি, ফ্রিজ, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ একে একে লুট করে নিয়ে যায় তারা।

তহবিলের অপমৃত্যু: সেবা দেওয়ার জন্য জমিয়ে রাখা নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকাও রেহাই পায়নি এই দানবীয় লুণ্ঠন থেকে।

বুলডোজারের আঘাতে ধূলিসাৎ গরিবের শেষ আশ্রয়

শুধু লুটপাটেই ক্ষান্ত হয়নি হামলাকারীরা। ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একের পর এক বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবন। যে ঘরে একসময় নতুন প্রাণের জন্ম হতো, শিশুদের পরম যত্নে টিকা দেওয়া হতো, আজ সেটির স্থানে ঝুলছে লোভী দখদারদের সাইনবোর্ড।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার জানান, এই বর্বরোচিত হামলায় প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ধ্বংসলীলার কারণে থমে গেছে সদ্য শুরু হতে যাওয়া সরকারি হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনসহ সব ধরনের টিকাদান ও প্রসূতি সেবা। গরিব মায়েদের চোখের জল আর অবুঝ শিশুর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে মিরপুরের বাতাস।

বিচার ও অধিকারের আকুতি: এখন সময় রুখে দাঁড়ানোর

৫০ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; এটি মিরপুরের লাখ লাখ প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার নাড়ির যোগসূত্র। জমি দখলের হীন উদ্দেশ্যে এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে বলে স্পষ্ট অভিযোগ কর্তৃপক্ষের।

ঘটনার পরই শাহআলী থানায় প্রধান অভিযুক্ত হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন—কত দ্রুত এই নরপিশাচদের মুখোশ উন্মোচিত হবে? কত দ্রুত আবার সচল হবে রাড্ডা চিকিৎসালয়ের বারান্দা?

প্রতিষ্ঠানটির একমাত্র দাবি: অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ আদায় এবং অবিলম্বে কেন্দ্রটি পুনর্নির্মাণ করে অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নির্বিঘ্ন করা। মানবতার এই ক্ষতচিহ্ন কি তবে এভাবেই মুছে যাবে, নাকি ন্যায়বিচার ফিরে পাবে তার নিজস্ব আলোয়?

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: