রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

বাংলাদেশ স্বখাতসলিলে ডুবতে চলেছে

লিখেছেন: অমিত গোস্বামী, কবি, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৮ এএম
বাংলাদেশ স্বখাতসলিলে ডুবতে চলেছে

বাংলাদেশ আজ স্বখ্যাতসলিলে ডুবে মরার জন্যে প্রস্তুত। ১৭ বছর নির্বাসিত থাকার পরে ভারতের পরোক্ষ সাহায্যে দেশে ফিরে সিংহাসনে তারেক রহমান বসেছেন ছয় মাসও নয়। কিন্তু তার পশ্চাতের দম আজ প্রকাশিত। সবাইকে খুশি করতে গিয়ে ডুবতে চলেছেন তারেক। কেন বলছি এই কথা?

১) আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত।

২) গত ৫ অগাস্ট ভারতে অবস্থানরত অবস্থায় এক লাইভ অডিও কনফারেন্সে সাংবাদিক সম্মেলন করেন নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ সরকার এটিকে সার্বভৌমত্বের অবমাননা ও চরম ক্ষোভের কারণ হিসেবে জানিয়েছে। ভারত জানিয়েছে অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যম আয়োজন করেছিল এবং এর সাথে ভারতীয় সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। সংবাদ সম্মেলনে হাসিনার বক্তব্য ছিল আগামী ডিসেম্বরে (বিজয়ের মাসে) তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দেশবাসীর প্রতি দেশে সাংবিধানিক অধিকার ও ন্যায়বিচার ফেরানোর ডাক দেন।

৩) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামিকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেওয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি ঘটাচ্ছে। এরপরে তারা শেখ হাসিনাকে বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তির ভিত্তিতে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত চান।

৪) গত ১০ অগাস্ট ভারতীয় রাস্ট্রদূত তারেক রহমানকে তারেক রহমানকে দ্বিপাক্ষিক সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। গত রোববার (১৬ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে সহায়ক পরিবেশ ভারতকে তৈরি করতে হবে। কীভাবে? ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে ও শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতকদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ৫) ভারত শর্তদুটিকে পাত্তা না দিয়ে জানিয়েছে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৬ সালে ২২ থেকে ২৫ অগাস্টের মধ্যে যে কোনদিন আধঘন্টা সময় দিতে প্রস্তুত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার জন্যে না’হলে এ’বছর আর সময় হবে না। পরিস্কার উপেক্ষা।

কিন্তু কেন এই উপেক্ষা?

১) ভারতের বিদেশনীতি যারা জানেন তারা বুঝবেন যে ভারত চেয়েছিল যে বাংলাদেশের সাথে বাংলাদেশের চারটি অতি প্রয়োজনীয় বিষয়ে কথা বলে বাংলাদেশকে আপাতত স্বস্তি দিতে। সেগুলি হল ডিজেল সরবরাহ, ফ্রি ট্রান্সমেন্টশিপ, গঙ্গা জলবন্টন চুক্তি ও ভিসা প্রদান।

২) বাংলাদেশে এই মুহুর্তে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট। ১২ থেকে ১৬ ঘন্টা লোডশেডিং। বার্ষিক নিয়মিত আমদানির বাইরেও বাড়তি প্রায় ৫০,০০০ টন ডিজেল ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’-এর মাধ্যমে শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে পাঠানোর অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিংয়ের মূল কারণ হলো প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে একটি অগ্নিকাণ্ডের জন্যে মোট চাহিদার ৩৫ শতাংশ গ্যাস পাচ্ছে না বিদ্যুতকেন্দ্রগুলি। মোট ৫০০০০ কোটি টাকা বাকি থাকায় বিদেশ থেকে গ্যাস আসছে না। হরমুজ প্রণালীও বন্ধ। কাজেই হাত পাতা ভারতের কাছে।

৩ ফ্রি-ট্রান্সশিপমেন্ট বন্ধ হওয়ায় ও বিদ্যুৎ সংকটে একের পর এক টেক্সটাইল কারখানা বসে যাচ্ছে। তার ওপরে তুলোর অভাব। চিন বেশি দামেও পাঠাচ্ছে না।

৪) গঙ্গা জলবন্টন চুক্তি শেষ হচ্ছে এ’বছরের শেষে। বাংলাদেশ আলোচনায় বসছে না। কাজেই ভারতের শর্তে জল সরবরাহ হবে। ভুগবে বাংলাদেশ।

৫) ভিসা প্রদান সবে চালু হয়েছিল। দিনে এক-দেড় লাখ মানুষ লাইন দিয়েছে। আবার বন্ধ হলে সাধারন বাংলাদেশি নাগরিককে ভুগতে হবে।

কিন্তু কী হতে চলেছে?

শেখ হাসিনার সরকার ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলিতে সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করতে সাহায্য করেছিল এটা সত্যি। কিন্তু ভারতের কাছ থেকে ১৩ টি সুবিধা যার মধ্যে ফ্রি-ট্রান্সশিপমেন্ট, সব ল্যান্ডপোর্ট ব্যবহার, স্বল্পমূল্যে ডিজেল, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনতে বিনা পয়সায় গ্রিড ব্যবহার, ভারতের জল বন্দর ব্যবহার, খাদ্যশষ্য আমদানি অনেক কিছুই আছে। অথচ বাংলাদেশ ট্রান্সপোর্ট করিডোর, রেল লাইন ব্যবহার, উত্তর পূর্ব রাজ্যে ইন্টারনেট লাইন পাঠানো কোন সুবিধাই দেয়নি। তার ওপরে শেখ হাসিনা যেতেই ‘চিকেন নেক’ নিয়ে, পাকিস্তান ও তুরস্ক’র সাথে আঁতাত করে, আইএসআই’কে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে, ভারতের সাথে বানিজ্যিক চুক্তি লঙ্ঘন করে মোহাম্মদ ইউনুস দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কবর দিয়েছিলেন। ভারতের সহায়তায় দেশে ফিরে তারেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি জামাতী ও পাকিস্তানী মৌলবাদীদের কথায় যে সুযোগ হাতছাড়া করলেন তার ফলশ্রুতি যা হতে চলেছে তা হল –

১) গতকাল ভারতের খাদ্যমন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশীর সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। যা অবশ্যই ইঙ্গিতবাহী খাদ্যশষ্য রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ করার দিকে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী এমনিতেই কঠিন মানুষ। অতিরিক্ত তো দূরের কথা চুক্তির ডিজেল পাঠাবে কিনা সন্দেহ। ইতিমধ্যে গ্রিড মেরামতির কাহিনী পল্লবিত হয়েছে। কাজেই নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি ব্যহত হতে পারে। আদানি কতদিন কত বিদ্যুৎ দেয় তাও দেখার ব্যাপার। ফলে অন্ধকারে বাংলাদেশ ডুবতে চলেছে।

২) ফ্রি-ট্রান্সশিপমেন্ট আবার চালু করার প্রশ্ন নেই। যদিওবা ভারত ভেবেছিল, কিন্তু বাংলাদেশ বৈঠকই চাইছে না, তাহলে কেন ভারত দেবে?

৩) সিন্ধু নদীর জল ভারত যেভাবে আটকে দিয়েছে ও ইচ্ছেমত ছাড়ছে, তাতে পাকিস্তান কিছু করতে পারছে কি? বাংলাদেশ যখন বসতেই চাইছে না, গঙ্গা জল চুক্তি নিয়ে ভারতের দায়টা কোথায়? ৪) ভিসা প্রদান নিয়ে ভারত যে উদার হবে না সেটা সহজেই অনুমেয়। সীমান্ত রাজ্যগুলি মূলত পশ্চিমবঙ্গ আগে সংখ্যালঘু তোষনকারী সরকারের শাসনে ছিল। এখন বিজেপি সরকার। কাজেই আগের মত মামাবাড়ির আদর পাওয়ার নয়। ফলে ভিসাও চাপবে ভারত।

৫) শেখ হাসিনাকে ভারত প্রত্যর্পণ করবে না। যদিও তিনি জানিয়েছেন তিনি প্রত্যাবর্তণ করবেন ৬ ডিসেম্বর। এখানেই নড়ে গেছে বর্তমান সরকার ও জামাতীরা। ভারত ইতিমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে যাবে প্রত্যর্পণজনিত মতামত নিতে। সেখানে ভারতের হয়ে আইনজীবি থাকবেন হরিশ সালভে বলে শোনা যাচ্ছে। সেই মতামত যদি শেখ হাসিনার পক্ষে যায় (গনতন্ত্রের নিয়মে যাবে) তাহলে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল কোর্টেও শেখ হাসিনা যাবেন এবং তার রায় শেখ হাসিনার পক্ষে যায় তা’হলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আইনত বৈধতা আদৌ থাকবে কি?

৬) শেখ হাসিনা যদি স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন করেন তা’হলে আন্তর্জাতিক মিডিয়া হামলে পড়বে। মানুষ উদ্বেলিত হবে। ভারত, আমেরিকা, চিন ও রাশিয়ার চাপ থাকবে শেখ হাসিনার মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে। গ্রেফতার করতেই পারে সরকার, কিন্তু তার ঠেলা সামলানো মুশকিল হবে। সে’দেশ না আবার জড়িয়ে পড়ে গৃহযুদ্ধে! সেক্ষেত্রে মসনদে আবার বসবেন শেখ হাসিনা।

সবমিলে বাংলাদেশ এই মুহুর্তে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় নয়, দাঁড়িয়ে পড়েছে সংঘাতের অভিমুখে। ভারত দ্রুত কাঁটাতার দিচ্ছে। স্মার্ট ফেন্সিং। ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশ নামক ঘোড়াকে জলাশয়ের পথ দেখাতে। কিন্তু ঘোড়া যদি জল না খেতে চায়, তা’হলে ডুবুক সে স্বখ্যাত সলিলে। তাতে ভারতের কী যায় আসে!

লেখক: অমিত গোস্বামী, কবি, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক