দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন উত্তাপ: শেখ হাসিনা ইস্যু ও দিল্লি-ওয়াশিংটনের গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বর্তমানে এক নতুন ও তীব্র উত্তাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতিকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহে রাজধানী ঢাকা ও নয়াদিল্লিতে একাধিক উচ্চপর্যায়ের গোপন ও প্রকাশ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ভূরাজনৈতিক সমীকরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হঠাৎ সরাসরি সম্পৃক্ততা পুরো পরিস্থিতিকে এক নতুন মোড় দিয়েছে। শেখ হাসিনা ইস্যু এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা এখন কেবল দুই প্রতিবেশী দেশের দ্বিপক্ষীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা আন্তর্জাতিক শক্তির মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের প্রথম মুখ খুলুন ও ওয়াশিংটনের অবস্থান
দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এক অন-ব্যাকগ্রাউন্ড ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রথমবারের মতো শেখ হাসিনা ইস্যু নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করেন। মার্কিন প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশকেই পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটি সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছাতে হবে। ওয়াশিংটন মনে করে, এই একটিমাত্র ইস্যুই বর্তমানে ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অস্বস্তিকর ও বৈরী কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে সরাসরি কোনো নাক না গলালেও, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে তাদের পরোক্ষ কূটনৈতিক চাপ ও আগ্রহ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
দিল্লিতে কূটনৈতিক তোড়জোড় ও মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভিড়
শেখ হাসিনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে দিল্লির কূটনৈতিক অঙ্গনে একের পর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ব্র্যান মাস্টার দিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রী এবং প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিংয়ের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক নীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণকারী এই নেতার সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এর পাশাপাশি, মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামরিক কমান্ডারদের ঘনঘন দিল্লি ও ঢাকা সফর আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশেষ করে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন ক্রিস্টেনসেন ঢাকা থেকে হুট করে দিল্লি গিয়ে মার্কিন বিশেষ দূত ও সামরিক কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক এবং তার ঠিক আগে ঢাকার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকরুজ্জামানের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত বৈঠক প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা চলছে।
গঙ্গা পানি চুক্তি ছাপিয়ে শেখ হাসিনা ও তারেক রহমানের সফর ইস্যু প্রধান ফোকাস
ডিসেম্বরে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চললেও, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ইস্যুটি নিয়ে দুই দেশের নীতিনির্ধারক মহলে তেমন কোনো আলোচনা নেই। পানি চুক্তির নবায়ন বা নতুন রূপরেখার চেয়েও বর্তমানে সবার প্রধান মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর।
শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরটি ঝুলে যায়। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, আগামী নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের শেষ দিকে বা শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক মিশনগুলো এই সফরকে সফল ও ফলপ্রসূ করতে পর্দার আড়ালে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, যাতে এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের বরফ জমা সম্পর্ক পুরোপুরি 'রিসেট' করা সম্ভব হয়।
সীমান্ত নিরাপত্তা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক নীতিতে চীনের প্রভাব প্রতিহত করা প্রধান লক্ষ্য। এই ভূরাজনৈতিক এজেন্ডায় ভারতের সক্রিয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতেই মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষভাবে তৎপর হয়েছে। ভারতের প্রধান দুটি উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে—সীমান্ত নিরাপত্তা ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ রক্ষা এবং অপরটি শেখ হাসিনার ইস্যু। দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিচ্ছে যে, ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে জোরপূর্বক প্রত্যর্পণ না করে বরং একটি মর্যাদাপূর্ণ ও প্রক্রিয়াজাত পন্থায় তাঁর নিজের ইচ্ছায় ফেরার পথ উন্মুক্ত রাখতে চায়, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও নিশ্চিত থাকবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে আইনি কাঠামোর মুখোমুখি করতে দেশে ফেরাতে আগ্রহী।
সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নাকি সাময়িক উত্তেজনা?
ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার বর্তমান টানাপোড়েন এবং এর পেছনে ওয়াশিংটনের তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। আগামী দিনে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা সংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর নির্ভর করছে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সুসম্পর্কের ভিত। এই কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী ও কার্যকর সমাধানে পৌঁছাবে, নাকি অতীতের মতো হঠাৎ করেই সব থমকে যাবে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
হামে হাজারো শিশু মৃত্যুর জের:বিশ্বমঞ্চে নজিরবিহীন ধাক্কা: আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বার্লিন সামিট থেকে বাদ পড়লেন ইউনূস ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সীমান্তবর্তী ভূ-রাজনীতি: ঢাকার পরিবর্তিত সমীকরণ এবং নয়াদিল্লির কড়া নিরাপত্তা বলয়
রেয়ার আর্থের লোভ ও বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ: ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনীতিতে মিয়ানমার নীতি বদল: নিষেধাজ্ঞা ভুলে জান্তা প্রধানের দোরে যুক্তরাষ্ট্র।