সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

রেয়ার আর্থের লোভ ও বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ: ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনীতিতে মিয়ানমার নীতি বদল: নিষেধাজ্ঞা ভুলে জান্তা প্রধানের দোরে যুক্তরাষ্ট্র।

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৯ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৪২ পিএম
রেয়ার আর্থের লোভ ও বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ: ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনীতিতে মিয়ানমার নীতি বদল: নিষেধাজ্ঞা ভুলে জান্তা প্রধানের দোরে যুক্তরাষ্ট্র।

১. দুর্লভ খনিজের মোহ ও ট্রাম্প প্রশাসনের নাটকীয় নীতি বদল

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের একচ্ছত্র প্রভাব খর্ব করতে এবং উচ্চ প্রযুক্তির অতিপ্রয়োজনীয় 'রেয়ার আর্থ' বা দুর্লভ খনিজের বাজার দখলে মিয়ানমারের প্রতি নিজেদের দীর্ঘদিনের নীতিতে রাতারাতি পরিবর্তন এনেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণতন্ত্র হরণের অভিযোগে যে সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তাঁর সাথেই সম্প্রতি গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স। মানবাধিকারের ঐতিহ্যবাহী বুলি উহ্য রেখে ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক বাস্তবমুখী ও লেনদেনমূলক কূটনীতি প্রমাণ করে যে, বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আদর্শের চেয়ে কাঁচামাল ও ভূকৌশলগত আধিপত্যই এখন সর্বেসর্বা।

২. কোকো দ্বীপ ও বঙ্গোপসাগরে চীনের গোপন অক্ষ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) আওতায় চীনের নিরঙ্কুশ দাপট বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত মিয়ানমারের কোকো দ্বীপে চীনের সম্ভাব্য গোপন সামরিক ঘাঁটি এবং নজরদারি কেন্দ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কৌশলগত উদ্বেগকে তীব্র করে তুলেছে। মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনের এই সরাসরি ভারত মহাসাগর প্রবেশাধিকার ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর এই লক্ষ্যেই ওয়াশিংটন মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সাথে সরাসরি চুক্তির পাশাপাশি নতুন আঞ্চলিক ছক কষতে শুরু করেছে।

৩. মহেশখালী দ্বীপ: ওয়াশিংটনের নতুন কৌশলগত 'হটস্পট'

মিয়ানমারের কোকো দ্বীপ এবং চীনা কার্যক্রমে নজরদারি রাখতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী। প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় ও ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এই দ্বীপে রাডার সিস্টেম বা সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার দীর্ঘদিনের আগ্রহ রয়েছে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও জ্বালানি খাতের বিনিয়োগের আড়ালে প্রস্তাবিত আকসা (ACSA) ও জিসুমিয়া (GSOMIA)-র মতো প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশকেও নিজেদের কৌশলগত বলয়ে টানতে চাইছে হোয়াইট হাউজ। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার পার্থে বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের সাথে মার্কিন কমান্ডিং জেনারেলের বৈঠকে এই ভূকৌশলগত চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে।

৪. পরাশক্তির সংঘাত ও বাংলাদেশের সামনে কঠিন কূটনীতির পরীক্ষা

মিয়ানমারের রেয়ার আর্থ খনিজের ক্ষেত্রে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে চুক্তি সেরেছে, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলছে বহুমুখী সামরিক পরিকল্পনা। ফলস্বরূপ, তাইওয়ান সংকটের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরও ভবিষ্যতে পরাশক্তিগুলোর সংঘাতের বিপজ্জনক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান সরকারের সমীকরণ মাথায় রেখে এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কীভাবে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। পরাশক্তির এই রেষারেষিতে বাংলাদেশ কি শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির ঘুঁটিতে পরিণত হবে, নাকি সুকৌশলে এড়িয়ে চলবে সংঘাতের এই বলয়?

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: