বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

ভুটানে শ্রম রপ্তানির আড়ালে বড় সড় চক্রান্ত: বিএনপির পুরনো 'মানব পাচার' সিন্ডিকেটের নয়া ফাঁদ?

লিখেছেন: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৬ এএম
ভুটানে শ্রম রপ্তানির আড়ালে বড় সড় চক্রান্ত: বিএনপির পুরনো 'মানব পাচার' সিন্ডিকেটের নয়া ফাঁদ?

বাংলাদেশের বিশাল অর্থনীতির তুলনায় ভুটান নেহাতই একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) যেখানে প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ভুটানের জিডিপি মাত্র ৩.৫৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, বাংলাদেশের অর্থনীতি ভুটানের তুলনায় প্রায় ১২৭ গুণ বড়। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশে বাংলাদেশি দক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর নীতিগত তৎপরতা ঘোষণা করা হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, ভুটানের প্রস্তাবিত ‘গ্যালেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি’ প্রকল্পে বাংলাদেশি জনশক্তি সরবরাহ করা হবে। কিন্তু এই ঘোষণার পেছনের বাস্তবতা, নীতিগত ভিত্তি এবং ঐতিহাসিক পটভূমি পর্যালোচনা করলে এক বিপজ্জনক চক্রান্তের চিত্র ভেসে ওঠে। প্রশ্ন উঠেছে, দেশীয় বেকারত্ব ঢাকার এই সস্তা উদ্যোগের আড়ালে পুনরায় কোনো নতুন মানব পাচার ও বাণিজ্য সিন্ডিকেটের জন্ম হতে যাচ্ছে কি না?

ভুটানের মোট জনসংখ্যা আট লাখেরও কম। একটি ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশে ‘গ্যালেফু সিটি’ বা যেকোনো নির্দিষ্ট অবকাঠামোগত প্রকল্পে ঠিক কতজন শ্রমিকের প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা প্রাক্কলন প্রকাশ করা হয়নি। ভুটানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রকৃত চাহিদা এবং সেখানকার অভিবাসন নীতির শর্তাবলি সংক্রান্ত কোনো সুস্পষ্ট তথ্য ছাড়াই কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার একটি প্রাথমিক বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে নীতি নির্ধারণ করা হচ্ছে। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি কীভাবে এত অপেশাদার ও অপক্ক সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়াতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন বিএনপি সরকারের মেয়াদে শ্রম রপ্তানির বিষয়টি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেই সময় মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, লিবিয়া, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইতালি, গ্রিস এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে শ্রমিক পাঠানোর নামে অবাধ লুটপাট ও জালিয়াতির নজির তৈরি হয়েছিল। ভুক্তভোগী হাজার হাজার মানুষের কান্না, সর্বস্বান্ত হওয়া পরিবার এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি

মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার ঘটনা আজও মুছে যায়নি। নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৎকালীন শ্রম রপ্তানি খাতের সিংহভাগ জুড়ে ছিল মানব পাচার, ভিসা জালিয়াতি এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রমিক শোষণ।

২০২৬ সালে এসে বিএনপি পুনরায় সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর, সেই একই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুরোনো শ্রম সিন্ডিকেট ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুটানের মতো ছোট একটি দেশে জনশক্তি রপ্তানির কাল্পনিক স্বপ্ন দেখিয়ে মূলত ভিসা বাণিজ্য এবং কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি নতুন আন্তর্জাতিক ফাঁদ তৈরি করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব আকাশচুম্বী। কোটি কোটি শিক্ষিত ও কর্মক্ষম তরুণ কর্মসংস্থানের অভাবে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। নতুন বিনিয়োগের অভাব এবং শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ সংকট দূর করতে ব্যর্থ হয়ে সরকার ভুটানে শ্রমিক পাঠানোর মতো একটি অবাস্তব গল্প সাজাচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পেরে ভুটানের মতো অতি ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া কোনো সাফল্য নয়, বরং এটি সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতারই স্পষ্ট দলিল।

একটি দেশের পররাষ্ট্র নীতির প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। জনশক্তি পাঠানোর পূর্বে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ন্যূনতম বেতন কাঠামো এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিএনপি সরকারের অতীত ও বর্তমান মেয়াদের কর্মপদ্ধতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব নীতিগত প্রস্তুতির কোনো অস্তিত্ব নেই। নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে পুনরায় যদি কেবল রাষ্ট্রীয় চালবাজি ও সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করার উদ্দেশ্যে ভুটান প্রকল্প শুরু হয়, তবে তা দেশের হাজার হাজার শ্রমিকের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেবে এবং আরেকটি নতুন মানব পাচারের অধ্যায় উন্মোচিত করবে।

লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক