বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

ডাল-ভাতে বিরিয়ানির সুবাস:বিশ্বমোড়লদের কাঁপুনি ও সাইড-বেঞ্চের মহাকাব্য: একটি সাংবাদিকীয় গীতিনাট্য

লিখেছেন: মাতব্বর শাকিল খান, সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিস্ট প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫০ এএম
ডাল-ভাতে বিরিয়ানির সুবাস:বিশ্বমোড়লদের কাঁপুনি ও সাইড-বেঞ্চের মহাকাব্য: একটি সাংবাদিকীয় গীতিনাট্য

সম্প্রতি দেশের এক শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের শিরোনাম দেখে পুরো জাতির বুক গর্বে ১০৪ ইঞ্চি চওড়া হয়ে গিয়েছিল। ইত্তেফাকের সেই জাঁকজমকপূর্ণ উপস্থাপনা পড়ে সাধারণ পাঠকের মনে এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়—একদিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মুগ্ধ হয়ে খাতা-কলম নিয়ে বসে আছেন, চীনের শি জিনপিং নোটে ভুল হচ্ছে কি না তা নিয়ে চিন্তিত, আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী চোখ বড় বড় করে শুনছেন মহাজাগতিক বাণী! জাতিসংঘের মূল মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নাকি পৃথিবীর তাবৎ পরাশক্তিকে বিশ্ব পরিচালনার একদম নতুন রেসিপি বুঝিয়ে দিচ্ছেন!

কিন্তু হায়! অনুসন্ধানী চশমা চোখের কোণে আঁটতেই থিওরির বেলুন এক নিমেষে ফুস!

আসল সত্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে দেখা গেল, পরাশক্তি দূরের কথা, ঘটনাটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল 'জেনারেল ডিবেট' বা মূল মঞ্চের ভাষণের ধারকাছ দিয়েও যায়নি। এটি ছিল জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কোনো এক পাশের ঘরে আয়োজিত “Social Business, Youth and Technology” শীর্ষক একটি হাই-লেভেল 'সাইড ইভেন্ট' বা পার্শ্ব-আয়োজন।

অনুষ্ঠানের অতিথিবৃন্দের তালিকা খেয়াল করলে সত্যের গভীরতা আরও খোলসা হয়। উপস্থিত সম্মানিত অতিথিদের প্রধান সারিতে ছিলেন পূর্ব তিমুরের (Timor-Leste) সম্মানীয় প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে। নিঃসন্দেহে তারা স্ব-মহিমায় অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। কিন্তু বাস্তবতার খাতা খুলে অর্থনীতির জিডিপি (GDP) হিসাব করলে পুরো রূপকথা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।

আজকের বাংলাদেশের যে সুবিশাল অর্থনৈতিক কলেবর, তার পাশে ভুটান কিংবা তিমুর-লেস্তের অর্থনীতির তুলনা করা মানে হাতির পাশে কিউট পুতুল বসিয়ে দেওয়ার মতো! অথচ আমাদের দেশীয় সংবাদমাধ্যমের উপস্থাপনার চাতুর্যে মনে হচ্ছিল যেন বৈশ্বিক অর্থনীতির জি-৭ (G7) সম্মেলন কাঁপিয়ে দিলেন আমাদের ডক্টর সাব!

অবশ্যই অনুষ্ঠান হয়েছে, জাতিসংঘ সদর দফতরেই হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা বক্তব্যও রেখেছেন এবং সেখানে অন্য দেশের সরকারপ্রধানও ছিলেন—কথা শতভাগ সত্যি। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, সাধারণ ডাল-ভাত টাইপের একটা ‘সাইড ইভেন্ট’-কে এমনভাবে বিরিয়ানির সাজে পরিবেশন করার মহতী উদ্দেশ্যটি কী? সাধারণ পাঠক কেন মনে করবেন যে জাতিসংঘের মূল মঞ্চে বিশ্ব মোড়লদের হাঁটু কাঁপিয়ে ঐতিহাসিক ভাষণ দেওয়া হয়ে গেছে?

এই রূপকথাতুল্য সংবাদ পাঠের পর সচেতন পাঠকের ঝুলিতে একটি অনন্য শিক্ষণীয় বাণী জমা হয়েছে—“জাতিসংঘ ভবনের ভেতরে একটা মাইক আর দুটো স্পিকার পেলেই তা সাধারণ পরিষদের ঐতিহাসিক মূল ভাষণ হয়ে যায় না!” সাইড বেঞ্চে বসে ফার্স্ট বয় হওয়ার নাটক বন্ধ করে খবরের আসল বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখাই এখন সময়ের দাবি।

লেখক: মাতব্বর শাকিল খান, সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিস্ট