বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সীমান্তবর্তী ভূ-রাজনীতি: ঢাকার পরিবর্তিত সমীকরণ এবং নয়াদিল্লির কড়া নিরাপত্তা বলয়
১. সীমান্তবর্তী উত্তেজনা ও সামরিক শক্তি প্রদর্শন
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ড্রোন ওড়ার ঘটনা এবং এস-৪০০ (S-400) এর মতো শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা পরখ করার মতো ঘটনাগুলো এই উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এই ধরনের যে কোনো ‘মিসঅ্যাডভেঞ্চার’ বা ভুল পদক্ষেপ কঠোর হাতে প্রতিহত করতে প্রস্তুত রয়েছে ভারত।
তেজপুর এয়ারবেসের আধুনিকীকরণ: আসামের তেজপুর এয়ারফোর্স স্টেশনকে একটি দুর্ভেদ্য সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করা হয়েছে। প্রায় ৪০০ একর জমিতে অ্যাডভান্সড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল লঞ্চপ্যাড স্থাপন করা হয়েছে।
শিলিগুড়ি করিডোর সুরক্ষা: বাংলার শিলিগুড়ি করিডোরে (Chicken's Neck) নতুন মিলিটারি স্টেশন চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং সেনা-বিমানবাহিনীর যৌথ যোগাযোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ছাবুয়া এয়ারবেস: এই এয়ারবেস থেকে একদিকে চীন সীমান্ত এবং অন্যদিকে বাংলাদেশ সীমান্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে।
২.পটভূমি ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ডামাডোল
বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে বাংলাদেশ। বিগত সরকার পতনের পর থেকে ঢাকার রাজনৈতিক ময়দানে যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, তা কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে এটি এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে সাবেক ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে পুনর্মিলনের সম্ভাবনার কথা বলছেন তারেক রহমানের প্রধান উপদেষ্টা জাহিদুর রহমান; অন্যদিকে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর ভেতরে অন্তর্দ্বন্দ্বের গুঞ্জন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
৩. কূটনৈতিক দৌত্যঝাঁপ ও নয়াদিল্লির কড়া বার্তা
বাংলাদেশের এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে হাত গুটিয়ে বসে নেই নয়াদিল্লি। ঢাকাস্থ ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দিনেশ ত্রিবেদীর আকস্মিক দিল্লি সফর এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক জল্পনার সৃষ্টি করেছে। গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সেনাবহিনীর অভ্যন্তরে বিভাজনের আঁচ এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ভারত তার পূর্ব সীমান্তে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে নারাজ। পাশাপাশি, তারেক রহমানের পক্ষ থেকে আগামী ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ইচ্ছা প্রকাশ করা হলেও, নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সবুজ সংকেত দেওয়া হয়নি।
৪. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও পাকিস্তান-তালিবান সমীকরণ
বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি আঞ্চলিক অন্যান্য সমীকরণও ঢাকার ওপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলছে। তালিবান কর্তৃক ওয়াকান কারিডোর চালু এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলানোর ঘোষণায় পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর ও ইসলামাবাদ চরম ব্যাকফুটে রয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান সেনার অন্দরে বিদ্রোহ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের ঘটনা পাক রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হতে চলেছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক শক্তির টানাপোড়েন পূর্ব ভারতের নিরাপত্তাকে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তবে নয়াদিল্লি যে পূর্ব সীমান্তে তাদের সামরিক প্রস্তুতি এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে কোনো ফাঁকফোকর রাখছে না, তা তেজপুর ও শিলিগুড়ির সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি থেকেই স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকা ও নয়াদিল্লি কীভাবে এই কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ সামাল দেয়।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
হামে হাজারো শিশু মৃত্যুর জের:বিশ্বমঞ্চে নজিরবিহীন ধাক্কা: আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বার্লিন সামিট থেকে বাদ পড়লেন ইউনূস ।
রেয়ার আর্থের লোভ ও বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ: ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনীতিতে মিয়ানমার নীতি বদল: নিষেধাজ্ঞা ভুলে জান্তা প্রধানের দোরে যুক্তরাষ্ট্র।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সামরিক কমান্ডের পুনর্গঠন: কে বসছেন বাংলাদেশের পরবর্তী শীর্ষ সেনা পদে?