সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সামরিক কমান্ডের পুনর্গঠন: কে বসছেন বাংলাদেশের পরবর্তী শীর্ষ সেনা পদে?

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩:১০ পিএম
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সামরিক কমান্ডের পুনর্গঠন: কে বসছেন বাংলাদেশের পরবর্তী শীর্ষ সেনা পদে?

বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে এক তীব্র ক্ষমতার টানাপড়েন ও রূপান্তরের গুঞ্জন চলছে। একদিকে বেসামরিক সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে আগামী ডিসেম্বর মাসের সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে দেশ এক জটিল ও ঐতিহাসিক ভূরাজনৈতিক সন্ধিক্ষণের মুখোমুখি। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বর্তমান অবস্থান, সামরিক কমান্ড কাঠামোতে হঠাৎ রদবদল এবং পরবর্তী সেনাপ্রধান কে হবেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

সামরিক কমান্ডে রদবদল ও সিভিল-সামরিক রিকলিব্রেশনের নেপথ্য কারণ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের পারস্পরিক আস্থার (Trust) সমীকরণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বরের সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তাপকে সামনে রেখে যেসব হাই-প্রোফাইল কমান্ড রদবদল বা পরিবর্তন কার্যকর করা হয়েছে, সেগুলোকে নিছক প্রশাসনিক রুটিন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ঢাকার নিরাপত্তা বলয় পুনর্গঠন:

গত ৮ সেপ্টেম্বরের পোস্টিং অর্ডারে জেনারেল ওয়াকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হঠাৎ করে কমান্ড পজিশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকার সুরক্ষার মূল স্তম্ভ ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং ৪৬ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পদাতিক ব্রিগেডারের অপসারণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

স্পর্শকাতর ফরমেশনে পরিবর্তন:

পাশাপাশি, সাভারের নবম এবং ঘাটাইল ১৯তম পদাতিক ডিভিশনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ফরমেশনগুলোতেও সমান্তরাল পরিবর্তন আনা হয়েছে।

কর্তৃত্ব খর্বের কৌশল: রাজধানী ঢাকার নিরাপত্তা বলয় পুনর্গঠনের এই কৌশলগত পদক্ষেপ অনেকের মতেই সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে কিছুটা হলেও সুদূরপ্রসারী উপায়ে ভারসাম্যপূর্ণ বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনার একটি কৌশলগত প্রয়াস।

ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ ও ডিসেম্বরের রাজনৈতিক সমীকরণশেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ ও কূটনৈতিক চাপ:

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ফ্ল্যাশপয়েন্ট। সম্প্রতি ভারতের হাই কমিশনার নিশ্চিত করেছেন যে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ বিচারিক পর্যালোচনাধীন রয়েছে, যদিও এর নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই।

রাজপথের সম্ভাব্য সংঘাত:

এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে অক্টোবর ও নভেম্বর জুড়ে রাজপথের তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত এবং ডিসেম্বরের দিকে রাজনৈতিক অচল অবস্থার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা ও তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার গুঞ্জন:

প্রশ্ন উঠেছে, পরিস্থিতি যদি চরম আকার ধারণ করে, তবে কি সেনাপ্রধানকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপে যেতে হবে? কিংবা ২০০৭ সালের ফখরুদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো কোনো মধ্যবর্তী বা বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে? এই প্রশ্নগুলোই বর্তমান রাজনৈতিক অন্দরমহলে নানা ডালপালা মেলছে।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বর্তমান অবস্থান ও টিকে থাকার কৌশল সমস্ত জল্পনা-কল্পনা ও কোণঠাসা করার গুঞ্জনকে পেছনে ফেলে জেনারেল ওয়াকারের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টিকে থাকা অত্যন্ত লক্ষণীয়।

কূটনৈতিক তৎপরতা: এই স্পর্শকাতর সময়ে তার অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সফর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অভিজ্ঞ ও চতুর নেতৃত্ব: বিগত আড়াই বছর ধরে অত্যন্ত ভঙ্গুর ও কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তিনি সকল পক্ষকে সন্তুষ্ট রেখে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী তার মেয়াদ ২০২৭ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে। ঐতিহাসিক ভূমিকা: উল্লেখ্য, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশত্যাগ করতে হয়েছিল। আর আজ ইতিহাস এমন এক চক্রাবর্তে উপনীত হয়েছে যে, তার মেয়াদের মধ্যেই সেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী সেনা সুরক্ষায় স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের গুঞ্জনে আলোচনায় এসেছেন। সামগ্রিক মূল্যায়নে, তার বিরুদ্ধে অপসারণের গুঞ্জন থাকলেও তিনি নিজস্ব কৌশলে তার বাকি মেয়াদ সফলভাবে পার করে দিতে পারেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সম্ভাব্য উত্তরসূরি: কে হচ্ছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরবর্তী সেনাপ্রধান? যদি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার মেয়াদ শেষে কিংবা কোনো নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন, তবে কে হতে পারেন তার পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত? বর্তমান সিনিয়র লেফট্যানেন্ট জেনারেলদের একটি তালিকা ও তাদের পটভূমি পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়:

1. লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ শাহিনুল হক: o বর্তমান পদ: কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (QMG), সেনা সদর দপ্তর। o ব্যাচ ও কোর: ২০তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্স (পদাতিক কোর)। o অবস্থান: জেনারেল ওয়াকারের ঠিক পরেই তিনি সবচেয়ে সিনিয়ر। তবে ২০২৭ সালের শুরুর দিকেই তার চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। 2. লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান: o বর্তমান পদ: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত রাষ্ট্রদূত। o ব্যাচ ও কোর: ২১তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্স (পদাতিক কোর)। o অবস্থান: শাহিনুল হকের পরবর্তী ব্যাচের কর্মকর্তা হলেও রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক কিছু বিতর্কের কারণে তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছিল বলে আলোচনা রয়েছে। 3. লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান: o বর্তমান পদ: কমান্ড্যান্ট, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (NDC), মিরপুর। o ব্যাচ ও কোর: ২৩তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্স (পদাতিক কোর)। o অবস্থান: জামায়াত সংশ্লিষ্টতার গুঞ্জন বা পূর্বের রাজনৈতিক পটভূমির কারণে শীর্ষ সেনাপ্রধান হওয়ার দৌড়ে তার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলে মনে করা হয়। 4. লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ মইনুর রহমান: o বর্তমান পদ: চিফ অব জেনারেল স্টাফ (CGS), সেনা সদর দপ্তর। o ব্যাচ ও কোর: ২৪তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্স (পদাতিক কোর)। o অবস্থান: বর্তমান সরকার পতনের পর পদোন্নতি পাওয়া এই কর্মকর্তা সামরিক হাই কমান্ডের অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক হিসেবে জোরালো অবস্থানে রয়েছেন। 5. লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান: o বর্তমান পদ: প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (PSO), সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। o ব্যাচ ও কোর: ২৪তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্স (পদাতিক কোর)। o অবস্থান: বর্তমান সরকারের আমলেই পদোন্নতিপ্রাপ্ত এই শক্তিশালী কর্মকর্তা বর্তমান ক্ষমতার সমীকরণে অন্যতম প্রধান দাবিদার। 6. লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসাদুল্লাহ মিনহাজুল আলম: o বর্তমান পদ: সাইপ্রাসে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা বাহিনীর ফোর্স কমান্ডার (সম্প্রতি দেশে প্রত্যাবর্তিত)। o ব্যাচ ও কোর: ২৫তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্স (পদাতিক কোর)। মূল মূল্যায়ন:

উপরোক্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ মইনুর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান—এই দুজনের পরবর্তী সেনাপ্রধান হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে জোরালো বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের মূল লক্ষ্য সেনাপ্রধানকে হঠাৎ বরখাস্ত করা নয়, বরং নিজেদের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান সুনিশ্চিত করতে পুরো সামরিক কমান্ড কাঠামোকে নতুন করে ঢেলে সাজানো। আগামী ডিসেম্বর মাসের রাজনৈতিক উত্তাপ, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং রাজপথের সংঘাতে সিভিল-সামরিক সম্পর্কের এই টানাপড়েন আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক ভাগ্য কোন দিকে পরিচালিত করবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত সংবাদ