মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আইন ও কূটনীতির বরফ গলছে: মোদি-ট্রাম্প ফোনালাপে কি কমল শুল্ক উদ্বেগ?
নতুন সমীকরণ ও মোদি-ট্রাম্প টেলিফোনালাপ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত নতুন রাশিয়া-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আইন কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব রাজনীতিতে যখন তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, ঠিক তখনই ফোনালাপে মিলিত হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩০ সেপ্টেম্বরের এই গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপে দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দীর্ঘ কূটনৈতিক ব্যবধান এবং নীতিগত মতবিরোধের মাঝে এই কথোপকথন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন গতি এনেছে।
শুল্ক আতঙ্ক ও জ্বালানি নিরাপত্তার জট
মার্কিন প্রশাসনের নতুন এই নিষেধাজ্ঞামূলক আইনের মূল লক্ষ্য রাশিয়া ও ইরানের জ্বালানি খাত। এই আইনের আওতায় রুশ জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক (সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত) আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে হোয়াইট হাউসকে। স্বাভাবিকভাবেই ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে দিল্লি তার গভীর উদ্বেগ ওয়াশিংটনের কাছে পরিষ্কার করে দিয়েছে। একদিকে রাশিয়ার কাছ থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে তেল আমদানির পথ খোলা রাখা এবং অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে লাভজনক বাণিজ্য চুক্তি টিকিয়ে রাখা—ভারতের জন্য এটি বর্তমানে এক কঠিন কূটনৈতিক উচ্চতার লড়াই।
বাণিজ্য চুক্তির টেবিলে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল
রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায়ে এই ফোনালাপের সমসাময়িক সময়েই মার্কিন মুলুকে অবস্থান করছেন ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল। ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, মোদি ও ট্রাম্পের ফোনালাপ বাণিজ্য আলোচনার এই পথকে আরও ত্বরান্বিত করবে এবং শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা কাটাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার জট খুলবে।
বৈশ্বিক কূটনীতি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ব্রিকস জোটের নানামুখী তৎপরতা এবং পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের মতো আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোও মোদি-ট্রাম্পের ফোনালাপে স্থান পেয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত সখ্য বজায় রাখার পাশাপাশি স্বাধীন বৈদেশিক নীতি রক্ষা করা—দিল্লির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে দুই নেতাই 'কম্প্রিহেনসিভ গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ' বা সার্বিক বৈশ্বিক অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
এনালাইটিক্যাল – এক্স হ্যান্ডেলে মোদির দাবি, দ্বিপাক্ষিক ঘনিষ্ট সম্পর্ক বজায় রাখতে সম্মত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, প্রযুক্তি-সহ একাধিক ক্ষেত্র নিয়ে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সন্ধ্যায় সমাজমাধ্যমের পোস্টে নিজেই একথা জানালেন তিনি। এক্স হ্যান্ডেলে মোদির দাবি, ‘বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-কে এগিয়ে নিয়ে যেতে, দ্বিপাক্ষিক ঘনিষ্ট সম্পর্ক বজায় রাখতে সম্মত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এক্স পোস্টে মোদি লিখেছেন, ‘‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমরা বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, জরুরি প্রযুক্তি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছি। বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিসরে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে একমত হয়েছি।’’ প্রধানমন্ত্রীর আরও লেখেন, ‘‘আমরা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও মতবিনিময় করেছি। যার মধ্যে রয়েছে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার অগ্রগতির ক্ষেত্রে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।’’
রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার খড়্গ এবং ভারতের জ্বালানি আমদানির বাস্তবতার মাঝে মোদি-ট্রাম্পের এই ফোনালাপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলানোর মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র যেমন ভারতকে হাতছাড়া করতে চায় না, তেমনই নয়াদিল্লিও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে কূটনীতির টেবিলেই সমাধান খুঁজছে। শেষ পর্যন্ত এই বোঝাপড়া কতটা টেকসই হয় এবং শুল্কের খাঁড়া থেকে ভারত পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)