বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

মামলার ‘বিশ্ব রেকর্ড’ নাকি বিচারকে প্রহসনে রূপান্তরের চক্রান্ত?

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৩ এএম
মামলার ‘বিশ্ব রেকর্ড’ নাকি বিচারকে প্রহসনে রূপান্তরের চক্রান্ত?

গিনেজ বুকের পাতায় প্রতিদিন কত অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য সব রেকর্ড ঠাঁই পায়। কিন্তু কোনো দেশের সাবেক সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে মামলার পাহাড় গড়ার বিচারহীনতার চর্চা কি কখনো কোনো রেকর্ডের খতিয়ানে উঠবে? একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৬৫০টিরও বেশি মামলা—বিশ্বের কোনো প্রান্তে, কোনো যুগে কি এমন নজির আছে? নাকি আমরা বিচার পাওয়ার তাড়নায় নয়, বরং গোটা বিচারব্যবস্থাকে বিশ্বদরবারে এক অদ্ভূত উপহাসের পাত্রে পরিণত করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে?

অঙ্গীকার যেন একটাই—যতক্ষণ না এই অন্ধ বিচারহীনতার প্রক্রিয়া চরম হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে, ততক্ষণ ওরা থামব না।

৬৫০ ছাড়ানো মামলার পাহাড়: বিচার নাকি এক মহ প্রহসন?

একজন মানুষের বিরুদ্ধে একই বিষয়ে, একই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কীভাবে সাড় ছয়শ মামলা হতে পারে? সারা পৃথিবীর মানুষ আজ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে এই বিচারিক অসংলগ্নতা। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট পথ ছেড়ে আমরা হাঁটছি কেবল সংখ্যার পেছনে দৌড়ানোর এক আত্মঘাতী পথে। অভিযোগের ওজন যত ভারীই হোক না কেন, যখন মামলার সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে চায়, তখন প্রকৃত অপরাধের বিচারই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আমরা কি বুঝতে পারছি না যে, এই অতি-উৎসাহের আড়ালে আসল বিচার প্রক্রিয়াটিকেই নীরবে হত্যা করা হচ্ছে?

ঝিনাইদহের মিছিল এবং এক অদ্ভুত প্রধান আসামি

সম্প্রতি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা ঠুকা হলো। মিছিল হলো একটি নির্দিষ্ট উপজেলায়, আর প্রধান আসামি করা হলো দেশের পাঁচ বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে! একটি স্থানীয় ঘটনার দায়ভার এভাবে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সমীকরণে টেনে আনার যৌক্তিকতা কোথায়? হাস্যকর এই ছক কি ন্যায়বিচারের নামান্তর, নাকি স্রেফ পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই নতুন মোড়কে আড়াল করার চেষ্টা? ঘটনার সাথে দূরতম সম্পর্ক না রেখেও প্রধান আসামি করার এই রেওয়াজ কি বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের শেষ আস্থাটুকুও ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে না?

‘পুলিশ বাদী হবে না’—সেই আশ্বাসের বলি যখন বাস্তবতা

সরকারের দায়িত্বশীল জায়গা থেকে বারবার অভয় দেওয়া হয়েছিল—কোনো পুলিশবাদী মামলা হবে না, অযথা কাউকে হয়রানি করা হবে না। দেশের স্বনামধন্য আইনি অভিভাবকেরাও এই সুরেই কথা বলেছিলেন। কিন্তু কোটচাঁদপুরের বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। সেখানে ব্যক্তি নয়, উপপরিদর্শক নিজেই বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেছেন। জাতীয় রিপোর্টার্স ইউনিটির অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে ঝিনাইদহের পথঘাট—প্রতিটি জায়গাতেই কি তবে আশ্বাসের মুখাদোশ খুলে পুলিশি মামলার পুরোনো চিত্রই বেরিয়ে আসছে? মুখের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব পদক্ষেপের এই আকাশ-পাতাল তফাত আমাদের আর কতদূর নিয়ে যাবে?

বিশ্বদরবারে বিচারের বিশ্বাসযোগ্যতা আজ কোন কিনারায়?

বিচার যখন একটি যুক্তিসঙ্গত আইনি প্রক্রিয়ার রূপ ছেড়ে সংখ্যা বাড়ানোর খেলায় পরিণত হয়, তখন তার গুরুত্ব আর বিশ্বজুড়ে থাকে না। পুরো দুনিয়া এখন প্রশ্ন তুলছে—এ কেমন বিচারিক চর্চা? যদি সত্যিই কেউ অতি-উৎসাহী হয়ে ৬৫০ মামলার নথি নিয়ে গিনেজ বুকে আবেদন ঠুকে দেয়, আর তারা যদি একে এক অনন্য ‘রেকর্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেয়—তবে তা কি বাংলাদেশের আইনের শাসন ও বিচারের ইতিহাসের ওপর এক চিরস্থায়ী কলঙ্ক লেপে দেবে না?

দায়িত্বপ্রাপ্ত মহল কি একবারও ভেবে দেখবেন, লোক হাসানো এই বিচার-তামাশা থামানোর সময় কি এখনো আসেনি?

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।