সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

শূন্যতা থেকে সৃষ্টির শিখরে: এক অদম্য কন্যার রূপকথা

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন ও আলিফ লায়লা হীরা প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৮ এএম
শূন্যতা থেকে সৃষ্টির শিখরে: এক অদম্য কন্যার রূপকথা

টুঙ্গিপাড়ার মধুমতি নদীর ঢেউ ছোঁয়া ধুলোবালি মেখে যে শিশুটি বড় হয়েছিল, কে জানত একদিন সেই শিশুকন্যাই হয়ে উঠবেন একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আস্থার প্রতীক? বাঙালির আবহমানকালের গ্রামীণ সংস্কৃতির চাদরে মোড়ানো যার শৈশব, জীবনের এক ক্রান্তিলগ্নে তাকেই কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল গোটা বাংলাদেশের পতাকা। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর অন্ধকার পেরিয়ে যিনি হয়ে উঠেছেন কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন, তিনি আমাদের শেখ হাসিনা।

টুঙ্গিপাড়ার উঠান থেকে ইতিহাসের অভিযাত্রায়

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় যখন পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মাতা বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছার কোল আলো করে তিনি এলেন, তখন বাইরে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের হাওয়া। কিন্তু সেই শিশুকন্যার জীবন কখনো সাধারণ দশটি শিশুর মতো ছিল না। বাবা বারবার রাজরোষে বন্দ, জেল-জুলুম আর পুলিশের কড়াকড়ি ছিল যাদের নিত্যসঙ্গী।

টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দির কিংবা আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয়ের আঙিনায় যার শিক্ষাজীবন শুরু, কৈশোর থেকেই যার রক্তে মিশে ছিল অধিকার আদায়ের স্লোগান। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬ দফা আন্দোলন—প্রতিটি পদক্ষেপে সহপাঠীদের নিয়ে রাজপথে মিছিলে প্রদীপের শিখার মতো জ্বলে উঠেছেন তিনি। ১৯৬৭ সালে পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম. এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে যখন তার জীবন বাঁধা পড়ে, তখনো তিনি এক সাধারণ গৃহবধূ। কিন্তু নিয়তি তার জন্য লিখে রেখেছিল এক মহাকাব্যিক পথচলা।

সব হারানোর বেদনা থেকে অপ্রতিরোধ্য নেতৃত্ব

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এক কালরাতে ঘাতকদের নির্মম বুলেটে সপরিবারে জাতির পিতা হারানোর সেই অপার্থিব শূন্যতা পৃথিবীর আর কোনো মানুষের জীবনে আসেনি। বিদেশে থাকায় ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে বেঁচে গেলেও তিনি হারিয়েছিলেন তার পুরো পৃথিবী—বাবা, মা, ভাইদের উষ্ণ সান্নিধ্য।

১৯৮১ সালের ১৭ মে। কালবৈশাখীর চাদর ভেদ করে যখন তিনি কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে পা রাখলেন, চারপাশ তখন লাখো মানুষের চোখের জলে সিক্ত। স্বজন হারানোর বেদনার পাহাড় বুকে চেপে তিনি সেদিন বলেছিলেন, “আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার একজন কর্মী, আপনাদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য আপনাদের নিয়ে নিরলস সংগ্রাম করে যাবো।”

গৃহবধূর চার দেয়াল ছেড়ে বাংলার মানুষের ভাঙা কুটিরে আলো জ্বালাতে যিনি এসেছিলেন, তাকে থামিয়ে দেওয়ার সাধ্য কার ছিল? সেনাশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—নেতৃত্ব কোনো ক্ষমতার আসন নয়, এটি মানুষের প্রতি অন্তহীন ভালোবাসার নাম।

তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নয়নের রোল মডেল

হেনরি কিঞ্জিংকারদের উপহাসের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে এক অপ্রতিরোধ্য অর্থনীতির নাম হিসেবে। সাবমেরিন কেবল থেকে মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের ওড়াউড়ি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো মেগাপ্রজেক্ট বাস্তবায়ন, কিংবা কর্ণফুলী টানেল ও মেট্রোরেলের দীপ্ত পথচলা—আজকের বাংলাদেশ মানেই এক অভাবনীয় রূপান্তর।

করোনা মহামারির সেই বৈশ্বিক সংকটেও যখন উন্নত বিশ্ব থমকে গিয়েছিল, তখনো তার দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সময়োচিত প্রণোদনা বাংলার একটি মানুষকেও অনাহারে থাকতে দেয়নি। নারীর ক্ষমতায়ন, মাথাপিছু আয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এই যজ্ঞ কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি ত্যাগের মহিমায় গড়া এক জীবন্ত ইতিহাস।

আলোর পথের সারথি

রাজনীতির বাইরেও তার মন জুড়ে আছে সাহিত্য আর সংস্কৃতির স্নিগ্ধতা। ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ কিংবা ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’র মতো গ্রন্থগুলো পড়লেই টের পাওয়া যায়, একজন রাষ্ট্রনায়কের কঠোর মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মমতাময়ী মায়ের বুকভরা কান্নার জল আর গভীর স্নেহ।

আজ বিশ্বমঞ্চে তিনি কেবল একজন সফল রাষ্ট্রপ্রধান নন; তিনি কোটি বাঙালির বুক চওড়া করার অহংকার। টুঙ্গিপাড়ার সেই খোকা মুজিবের রক্ত ও আদর্শের উত্তরাধিকার বহন করে যিনি আজ বিশ্বজয়ী বাংলার প্রতিমা। বাংলার ইতিহাসে তার নাম চিরকাল খোদাই থাকবে এক অদম্য রূপকার ও মমতার নদী হয়ে।

আজকের এই বিশেষ দিনে আপনার মনের আয়নায় শেখ হাসিনার দীর্ঘ এই সংগ্রামী জীবনযাত্রার কোন দিকটি সবচেয়ে বেশি গভীর রেখাপাত করে?

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) ও আলিফ লায়লা হীরা—শিক্ষকতা থেকে উদ্যোক্তা ও সফল ব্যবসায়ী।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত সংবাদ