সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

দখলে মত্ত নিজস্ব ক্যাডাররাই: কাঠগড়ায় সরকার, অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানে ব্যাকফুটে বিএনপি

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:০৯ পিএম
দখলে মত্ত নিজস্ব ক্যাডাররাই: কাঠগড়ায় সরকার, অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানে ব্যাকফুটে বিএনপি

রাজধানীর বুকে বুলডোজার চালিয়ে প্রাচীন স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুড়িয়ে দেওয়া কিংবা জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিওতে মধ্যরাতে সশস্ত্র তাণ্ডব—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক দখলদারত্ব, লুটপাট ও ভাঙচুরের বীভৎস মহোৎসবে চরম বিব্রত ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা ও সুশাসন ফেরাতে কঠোর হাতে চেষ্টা চালাচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই দলের কিছু অতিউৎসাহী ও বেপরোয়া নেতাকর্মীর বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডে খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি। পেশিশক্তি আর দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার করে খাসজমি দখল, চাঁদাবাজি এবং নৈরাজ্য সৃষ্টির এই অবাধ পৈশাচিকতা শুধু প্রশাসনকেই নয়, পুরো দেশকে এক গভীর অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

রাড্ডার রাক্ষুসে থাবা ও নজিরবিহীন ভাঙচুর

সাম্প্রতিক দেশজোড়া নাশকতার সবচেয়ে ন্যক্কারজনক অধ্যায়টি রচিত হয়েছে রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ গুঁড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। মধ্যরাতে ভারী এক্সক্যাভেটর ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নৃশংস হামলা চালিয়ে তা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, ধ্বংসস্তূপের ওপর ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দখলদারদের আসল রূপ উন্মোচিত হয়েছে।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। হামলাকারীদের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন, বিএনপি নেতা হানিফ মিয়া এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেল। ঘটনাস্থলে সশরীরে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন (নাডা আওলাদ) ও ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াস। এই পুরো চক্রটি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির অতিঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত। জনগণের করের অর্থে চলা একটি চিকিৎসাকেন্দ্র দখলের এই জঘন্য অপরাধের দায়ে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং পুলিশ ডজনখানেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে।

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে তাণ্ডব ও মোহাম্মদপুরের ত্রাস

শুধু মিরপুরেই নয়, ইসিবি চত্বরে জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’-তে অতর্কিত হামলা, ভাঙচুর ও সর্বস্ব লুটের ঘটনায় সরকারের ভেতরে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শেখেরটেকে জমি ও বাড়ি দখলের ঘটনায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে স্থানীয় দুর্বৃত্তরা। সরকারের শীর্ষ মহলের কঠোর নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করলেও, বারবার ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নাম আসায় জনমনে দেখা দিয়েছে তীব্র প্রশ্ন ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।

টিআইবি ও বিশিষ্ট নাগরিকদের হুঁশিয়ারি এবং কঠোর অবস্থানে প্রশাসন

দেশের এই লাগামহীন অরাজকতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং দেশের ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক। সুলতানা কামাল, আনু মুহাম্মদ, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও ব্যারিস্টার সারা হোসেনসহ বিশিষ্টজনেরা এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলেছেন, এসব কেবল বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নয়; এর পেছনে শাসকদলের প্রভাবশালী মহল, পতিত স্বৈরাচারের দোসর এবং প্রশাসনের একাংশের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দেশ-বিদেশের পৃষ্ঠপোষকদের মুখোশ উন্মোচন না করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও শুদ্ধি অভিযানের ঘোষণা

দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা এমন দুর্বৃত্ত ও চাঁদাবাজদের কারণে সরকারের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় এবার নড়েচড়ে বসেছে বিএনপি হাইকমান্ড। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের স্পষ্ট নির্দেশ—অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় থাকতে পারে না। কারা পর্দার আড়ালে থেকে এসব ক্যাডারদের মদদ দিচ্ছে এবং ইন্ধন জোগাচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে কঠোর অভ্যন্তরীণ তদন্ত। তদন্তে যারই নাম আসবে, তার বিরুদ্ধে শুধু সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই নেওয়া হবে না, বরং আইনি কাঠামোর আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এদিকে, সরকারের নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হামলা ও দখলের এসব ন্যক্কারজনক ঘটনায় সরকার লজ্জিত ও বিব্রত। কোনো অপরাধীকে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না। এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন যে, দলীয় বা ক্ষমতার কোনো ব্যানার বিবেচনা না করে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও দখলদারদের তালিকা তৈরি করে আইনের মুখোমুখি করতে হবে।

ক্ষমতার মোহে মত্ত দলের ভেতরের এই উইপোকাদের দমন করা না গেলে সরকারের কাঠামোগত অর্জনগুলো ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে—এমন কঠোর বার্তা নিয়েই এখন মাঠে নেমেছে সরকার ও দলীয় নীতিনির্ধারক মহল।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত সংবাদ