সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

হামে হাজারো শিশু মৃত্যুর জের:বিশ্বমঞ্চে নজিরবিহীন ধাক্কা: আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বার্লিন সামিট থেকে বাদ পড়লেন ইউনূস ।

✍ লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১:১৮ পিএম
হামে হাজারো শিশু মৃত্যুর জের:বিশ্বমঞ্চে নজিরবিহীন ধাক্কা: আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বার্লিন সামিট থেকে বাদ পড়লেন ইউনূস ।

জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিতব্য মর্যাদাপূর্ণ ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট ২০২৬-এর বিশেষ বক্তার তালিকা থেকে শেষ মুহূর্তে বাদ পড়েছেন বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূস। নোবেল প্রাপ্তির দীর্ঘ দুই দশকের ইতিহাসে কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমন্ত্রিত হওয়ার পর নাম কেটে দেওয়ার এমন ঘটনা অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও নজিরবিহীন। একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা, ইউরোপীয় সংগঠনের তীব্র আপত্তি এবং নিরাপত্তা শঙ্কার মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

১. শিশু মৃত্যুর দায় এবং স্বাস্থ্য খাতের নজিরবিহীন বিপর্যয়

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মারাত্মক ধস নামে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে হাম ও এর সদৃশ উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে ১,১৫৬ জন শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৮ জনে, যার সিংহভাগই পাঁচ বছরের কম বয়সী অবুঝ শিশু। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, এটি কোনো সাধারণ স্বাস্থ্যগত দুর্ঘটনা নয়, বরং নীতিগত বিভ্রান্তি এবং চরম প্রশাসনিক অবহেলার ফল।

২. হটকারী সিদ্ধান্ত ও টিকাদান কর্মসূচিতে স্থবিরতা

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ইউনূস সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের মার্চের দিকে বহু পরীক্ষিত স্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং এর অধীনস্থ ওপি ব্যবস্থা হঠাৎ বাতিল করে দেয়। এর ফলে স্বাস্থ্য প্রশাসনে শূন্যতা তৈরি হয়। এছাড়া, বিশ্বখ্যাত সরবরাহকারী সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে ও সহজ শর্তে হাম-রুবেলা টিকা পাওয়ার যে প্রি-ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থা ছিল, তা স্থগিত করা হয়। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে বারবার লিখিত ও মৌখিক সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও তৎকালীন প্রশাসন তাতে কর্ণপাত করেনি, যার চড়া মূল্য দিতে হয়েছে দেশের হাজারো শিশুকে।

৩. আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ইউরোপীয় সংগঠনের বহুমুখী চাপ

মোহাম্মদ ইউনূসের বার্লিন সামিটে অংশগ্রহণ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়:

ইউরোপীয় সংগঠনের রিট:

বেলজিয়ামের সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম, ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরামসহ পাঁচটি আন্তর্জাতিক নাগরিক সংগঠন যৌথভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে পিটিশন দাখিল করে।

গ্যাভি ও অন্যান্য সংস্থার আপত্তি:

গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি), ইউনিসেফ, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এবং রেড ক্রস সোসাইটি ইউনূসের উপস্থিতির বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়। তাদের মতে, বাংলাদেশে হামের প্রকোপ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট মানবসৃষ্ট সংকট।

৪. বার্লিন সামিটের এজেন্ডায় বাংলাদেশ ও ইউনূসের অনুপস্থিতি

১১ থেকে ১৩ অক্টোবর বার্লিনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট ও স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সম্মেলনের অন্যতম প্রধান সেশন "হেলথ ইন ফ্রাজিল কনটেক্সট"-এ বাংলাদেশকে একটি প্রধান কেস স্টাডি হিসেবে রাখা হয়েছে, যেখানে সাবেক সরকারের আমলে টিকার নীতিগত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সৃষ্ট মহামারি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউনূসের উপস্থিতি অযাচিত বিতর্ক তৈরি করত। তাঁর পরিবর্তে বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে যোগ দিচ্ছেন সরকারের প্রতিনিধিরা।

৫. নিরাপত্তা শঙ্কা ও কূটনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতি

জার্মানিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশের অনুমতির কারণে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আন্তর্জাতিক চাপ, সুশীল সমাজের জোরালো আপত্তি এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পিকার তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দিতে বাধ্য হয়। ২০০৬ সালে নোবেল পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক কোনো ফোরামে এ ধরনের প্রত্যাখ্যান ইউনূসের ক্যারিয়ারে এক বড় কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: