সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ইস্যু: ওয়াশিংটন, দিল্লি এবং ঢাকার ত্রিমুখী কূটনীতি

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:০২ পিএম
শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ইস্যু: ওয়াশিংটন, দিল্লি এবং ঢাকার ত্রিমুখী কূটনীতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এখন সবচেয়ে বড় ও স্পর্শকাতর প্রশ্ন—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং এর ফলে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ময়দান—সবখানেই এখন প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এই একটিমাত্র ইস্যু। এই জটিল প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা কূটনৈতিক বার্তা পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলী অবস্থান ও দ্বিমুখী নীতি

নিউইয়র্কের ফরেন প্রেস সেন্টারে অনুষ্ঠিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আখতার শেখ হাসিনা ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। দীর্ঘ দিন ধরে এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন রাখঢাক রাখলেও, এই প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বা তার বিরুদ্ধে চলা বিচার প্রক্রিয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে এটিকে ঢাকা ও দিল্লির পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দেশটির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের কথা মাথায় রেখেই ওয়াশিংটন এই সংকট সমাধানের ভার মূলত ভারতের ওপর ছেড়ে দিতে চাইছে। তবে একই ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কার্যক্রমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্ন উঠলে মার্কিন কর্মকর্তা সাফ জানিয়ে দেন যে, এটি সম্পূর্ণ বাংলাদেশের সার্বভৌম সরকারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের বিষয়। মার্কিন প্রশাসন সরাসরি কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে নারাজ, যদিও পর্দার আড়ালে তাদের ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত স্পষ্ট।

বহুমুখী কূটনীতি ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সমীকরণ বর্তমান সরকারের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কের টানটান ও ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলেও কূটনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব জোরালো করার কথা বললেও, ওয়াশিংটন সফরে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের সূচি নিয়ে কিছু ধোঁয়াশা থেকেই গেছে। বিশেষ করে, বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক কিংবা যোগাযোগের ব্যত্যয় আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল চালকে ফুটিয়ে তোলে।

পাশাপাশি, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন পরাশক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের বাধ্যবাধকতা এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাতে বাংলাদেশ আজ এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

পরিশেষে বলা যায়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা কেবল একটি আইনি বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াই নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং বাংলাদেশের ত্রিমুখী কূটনৈতিক বোঝাপড়ার ওপরই নির্ভর করছে আগামীদিনের রাজনৈতিক স্থায়িত্ব। সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এই জটিল সমীকরণ কীভাবে সমাধান হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত সংবাদ