শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

কুৎসিত আত্মসমর্পণ ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতি: সৌদিতে দুই বাংলাদেশির ফাঁসি এবং প্রশাসনের নির্লজ্জ উদাসীনতা ।

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৪৩ পিএম
কুৎসিত আত্মসমর্পণ ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতি: সৌদিতে দুই বাংলাদেশির ফাঁসি এবং প্রশাসনের নির্লজ্জ উদাসীনতা ।

সৌদি আরবের মাটিতে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের গোপন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চরম মেরুদণ্ডহীন ও অপদার্থ ভূমিকা এক নজিরবিহীন কলঙ্কজনক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে।

ভিয়েনা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লংঘন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির মৌলিক শিষ্টাচার পদদলিত হওয়ার পরও ঢাকাস্থ সৌদি রাষ্ট্রদূতের সামনে নতজানু হয়ে থাকা এবং উল্টো নিজ দেশের নাগরিকদেরই 'শিক্ষা নেওয়া উচিত' বলে সাফাই গাওয়ার মতো ধৃষ্টতা এই দেউলিয়া প্রশাসনের নৈতিক পতনকেই উন্মোচিত করে।

কূটনীতির খোলসে চরম ব্যর্থতা ও পরনির্ভরশীলতা

গত ১৪ অক্টোবর সৌদি প্রেস এজেন্সির মাধ্যমে মক্কায় দুই বাংলাদেশি—নজরুল ইসলাম ও সীতি আক্তারের—মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ্যে আসে। অথচ এর আগের দিনই ১৩ অক্টোবর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়দ ইসলাম ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আব্দুল্লাহ বিন জাফর আল-হাপিয়ার সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল বৈঠকে লিপ্ত ছিলেন। নির্মম হলো, ফাঁসি কার্যকরের তিন দিন পরও জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট এই দুই নাগরিকের পরিচয় বা নাগরিকত্ব পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি।

অথচ অতীতে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা কিংবা ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো নিজ নাগরিকদের রক্ষায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয়ে সমঝোতা করেছে ।

এমনকি খোদ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশিকে ব্যপক কুটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। সেখানে বর্তমান সরকারের নতজানু ও মেরুদণ্ডহীন কূটনীতি কেবল প্রবাসীদের জীবনকেই হুমকির মুখে ফেলেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সার্বভৌমত্বকে চিরতরে বিকিয়ে দিয়েছে।

সার্বভৌমত্বের অবমাননা ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা

সৌদি আরবের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘ ধাপ—পুলিশি তদন্ত, একাধিক আদালতের শুনানি, আপিল বেঞ্চ এবং বাদশার রাজকীয় অনুমোদনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমা পেরিয়ে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক মিশন সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মোসীর ভাষায়, "সৌদি সরকার জানায়নি—এমন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যিনি এটি বলেছেন, তিনি সম্পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলেছেন।"

সৌদি রাষ্ট্রদূতের লাগাতার ঔদ্ধত্য ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ দেশের মাটিতে বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সেমিনারে সৌদি রাষ্ট্রদূতের পূর্বানুমতি থাকা সত্ত্বেও অনুপস্থিত থাকা এবং বিগত দিনে ভিসা প্রসেসিং ও থার্ড-পার্টি এজেন্সির স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে টু শব্দটি করার সাহসও দেখায়নি এই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রেমিট্যান্সের অন্ধ মোহে দেশের নাগরিকদের রক্ত ও অধিকারকে জলাঞ্জলি দিয়ে এই অপদার্থ প্রশাসন যে আত্মঘাতী নীতি গ্রহণ করেছে, তা স্বাধীন দেশের মর্যাদার ওপর এক চরম চপেটাঘাত।

"ভিয়েনা প্রটোকলের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি নাগরিক আটক বা বন্দি হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার দূতাবাসকে অবহিত করা মৌলিক মানবাধিকার। অথচ এই নগ্ন লঙ্ঘনের পরও রাষ্ট্রদূতকে কড়া তলব করার সাহস না দেখিয়ে বরং 'নোট ভার্বাল' হস্তান্তর করে বৈঠক সেরে নেওয়া এবং নিজ দেশের প্রবাসীদের ওপর দোষ চাপানো চূড়ান্ত পর্যায়ের অপরাধ।"

চূড়ান্ত জবাবদিহির সময় এখনই

ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ইথিওপিয়া কিংবা ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো যখন তাদের শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন ও অবিচারের প্রতিবাদে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো স্থগিত করেছে, তখন তথাকথিত "সবার আগে বাংলাদেশ" স্লোগানধারী এই সরকার প্রবাসীদের জীবনকে পণ্যে পরিণত করেছে। নতজানু পররাষ্ট্রনীতির এই বেহাল দশা চলতে থাকলে দেশের স্বার্থ চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। জনগণের মৌলিক অধিকার ও প্রবাসীদের রক্তের মূল্য যারা বোঝে না, সেই ব্যর্থ ও মেরুদণ্ডহীন প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সময় এখনই উপস্থিত।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: