সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

ধানক্ষেতে শেষ আকুতি ‘বাবা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে...’—কাগজে-কলমে নিরাপদ রাষ্ট্রে একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়ার গল্প ।

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৪৬ পিএম
ধানক্ষেতে শেষ আকুতি ‘বাবা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে...’—কাগজে-কলমে নিরাপদ রাষ্ট্রে একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়ার গল্প ।

ভূ-রাজনীতি, ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ আর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কঠিন সমীকরণ নিয়ে আজ লেখার টেবিলে বসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই বুকফাটা এক হাহাকার এসে সমস্ত চিন্তা অচল করে দিল। সব জটিল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আজ অসার মনে হচ্ছে, কারণ আজ আমায় লিখতে হচ্ছে কুমিল্লার সেই ছোট্ট মেয়েটার গল্প। যার বেঁচে থাকার আকুতি ভেসে গেছে গভীর রাতের নিস্তব্ধতায়, আর জবাব মেলেনি বাবার কাছে পাঠানো শেষ বার্তাটিরও।

“বাবা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, আমায় বাঁচাও”

সপ্তম শ্রেণিতে পড়া জান্নাতুত তাজমীন। জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলো ডানা মেলার কথা ছিল যে বয়সে, সেই বয়সেই তাকে জীবন থেকে বিদায় নিতে হলো চরম নির্মমতায়।

মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে বাঁচতে চেয়েছিল মেয়েটি। প্রাণপণ শক্তিতে দৌড়েছিল কাদা-মাখা ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে। মোবাইলের স্ক্রিনে কাঁপতে কাাঁপতে বাবার কাছে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন আর এক করুণ আকুতি— “বাবা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, তুমি এসে উদ্ধার করো...”।

কিন্তু দুর্ভাগ্য! যখন বাবার ঘুম ভাঙল এবং ভোরবেলায় মেসেজটি দেখলেন, ততক্ষণে সব শেষ। একটি ধানক্ষেতের মাঝে পড়ে রইল সপ্তম শ্রেণির জান্নাতের নিথর দেহ। ধারণা করা হচ্ছে, সিএনজিচালক কিংবা কোনো পাশবিক মানসিকতার দুর্বৃত্ত তাকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। উঠেছে পাশবিক নির্যাতনেরও অভিযোগ।

এই যে চার দিন নিখোঁজ থাকার পর একটি অবোধ শিশুর নিথর দেহ ভেসে উঠল কুমিল্লার মাঠে—এমন এক রক্তে ভেজা বাংলাদেশই কি আমরা চেয়েছিলাম?

অপরাধ কি শুধু পরিসংখ্যানের খেলা?

আমরা প্রায়ই পরিসংখ্যানের পাতায় নিজেদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করি। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে অপরাধ হয় না। 'ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ'-এর ২০২৫-এর ইনডেক্স দেখলে অনেকেই হয়তো অবাক হবেন—পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি সংগঠিত অপরাধ (Organized Crime) হয় মিয়ানমারে!

এমনকি জার্মানি, স্পেন, সৌদি আরব কিংবা মালয়েশিয়ার অবস্থানও এই তালিকার অনেক ওপরের দিকে। মালয়েশিয়া ৩৪, সৌদি আরব ৪২, স্পেন ৪৮, জার্মানি ৭৪—আর সেই জায়গায় বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম। সূচক অনুযায়ী, অবস্থান যত ওপরে, অপরাধ তত বেশি। অর্থাৎ, তথ্য বলছে বাংলাদেশ যেন বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়েও অপরাধমুক্ত!

কিন্তু এই কাগজ-কলমের হিসাবের পেছনে মূল সত্য লুকিয়ে রয়েছে অন্য জায়গায়।

আমরা কি প্রতিদিনকার জীবনযাপনে নিরাপদ?

সংগঠিত অপরাধে আমরা হয়তো পিছিয়ে, কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রতিদিনের পথচলায় আমরা কতটা নিরাপদ?

২০২৬ সালের 'নুমবেও (Numbeo) ক্রাইম ইনডেক্স'-এর দিকে তাকালেই থমকে যেতে হয়। সেখানে দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তার নিরিখে মোট ১৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৬তম! এখানে সূচক যত নিচে, দেশ তত নিরাপদ। সৌদি আরবের অবস্থান ১৩৫, স্পেন ৯৭, জার্মানি ৯৫, মালয়েশিয়া ৬১।

অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনে, প্রতিদিনের চলাফেরায় বাংলাদেশ অপরাধের এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলয়। মাদক চোরাচালান বা আন্তর্জাতিক মাফিয়া নেটওয়ার্কের পরিসংখ্যান যা-ই বলুক না কেন, বাংলাদেশের পথে-ঘাটে বের হলে আমাদের মা-বোনেরা জীবনের কোনো নিরাপত্তা পান না। আমার ধারণা, মানুষ যদি থানায় গিয়ে সব ঘটনার সত্য রিপোর্ট করতে পারত, তবে এই তালিকায় আমাদের স্থান প্রথম এক বা দুইয়ের মধ্যে থাকত!

সৌদি আরবে হয়তো শাসনব্যবস্থা বা ক্ষমতার রাজনীতির নানান আলোচনা রয়েছে, কিন্তু সেখানকার এলিটশ্রেণী রাজপথে অন্তত আইনের শাসন নিশ্চিত করেছে। সেখানে অনিয়ম করলে কিংবা সাধারণ নাগরিককে আঘাত করলে শাস্তি অবধারিত। আর তাই সৌদি আরব বা ইউরোপের এস্তোনিয়ার মতো দেশে প্রতিদিনকার জীবন সুরক্ষিত।

উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপের ছোট্ট দেশ এস্তোনিয়ায় (যেখানে ক্রাইম ইনডেক্সে অবস্থান ১৩৪) অপরাধ নেই বললেই চলে। গভীর রাতে কফির মগ হাতে রাস্তায় নিশ্চিন্তে হেঁটে বেড়ানো যায়, কিংবা সদর দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়ে পড়া যায়। সেখানকার ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণির শিশুরা একা একা বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার মতো নিরাপদ পরিবেশ পায়।

কিন্তু আমরা কি পারি? আমরা কি পারি একটি রাতও নিশ্চিন্তে ঘুমাতে? ঘর থেকে প্রিয় মানুষটি বের হলে সে কি জীবিত ফিরে আসবে—এই চিন্তায় বুকের ভেতরটা কি প্রতি মুহূর্তে ধুকধুক করে না?

বিচারে শূন্যতা এবং আমাদের ব্যর্থতা

কেন কুমিল্লার জান্নাতের মতো হাজারো নিষ্পাপ প্রাণ বারবার এভাবে ঝরে যাচ্ছে? কেন থামছে না এই নারকীয়তা?

উত্তরটা খুব তিক্ত হলেও সত্য—আমাদের দেশে অপরাধের কোনো দৃশ্যমান বিচার নেই। এখানে শাসক বা সমাজের এলিট শ্রেণি কেবল নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত, সম্পদ লুটে নিয়ে বিদেশে বেগমপাড়া বানাতে ব্যস্ত। সাধারণ মানুষের জীবনের সামান্যতম মূল্যও এই ব্যবস্থার কাছে নেই। না আছে কঠোর আইন, না আছে আইনের সঠিক প্রয়োগ, না আছে সময়মতো বিচারের নজির।

এখানে প্রতিটি পদক্ষেপে ভোগান্তি, প্রতিটা দিন বেঁচে থাকাটাই একটা অলৌকিক ব্যাপার। শেষ প্রশ্নটি রেখে গেলাম... এখন প্রশ্ন হচ্ছে— আর কত জান্নাতের রক্তে ভিজলে আমাদের এই নিথর ঘুম ভাঙবে? কতগুলো করুণ শেষ আকুতি অগোচরে হারিয়ে গেলে আমাদের টনক নড়বে? যে দেশে একটি অবোধ শিশু লাইভ লোকেশন পাঠিয়েও বাঁচতে পারে না, সেই দেশে পরিসংখ্যান দেখিয়ে কত দিন নিজেদের সভ্য বলে দাবি করব আমরা?

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: