মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

এলএনজি চুক্তি: শেখ হাসিনা সরকারের থেকে দুই গুণ দামে LNG কিনার চুক্তি নাকি দুর্নীতির মহাউৎসব?

লিখেছেন: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৭ এএম
এলএনজি চুক্তি: শেখ হাসিনা সরকারের থেকে দুই গুণ দামে LNG কিনার চুক্তি নাকি দুর্নীতির মহাউৎসব?

বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা সরাসরি সম্পর্কিত। গ্যাসের সংকট মানে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যা নয়—কারখানা বন্ধ হওয়া, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কর্মসংস্থান কমে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়া।

এই বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কত দামে গ্যাস কিনছে এবং সেই দামের কাঠামো ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির ওপর কী ধরনের বোঝা তৈরি করবে?

সাম্প্রতিক আমেরিকান প্রতিষ্ঠান Gunvor এর সাথে যে LNG চুক্তি হয়েছে সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

শেখ হাসিনা সরকারের সময় কাতার এনার্জির সঙ্গে বাংলাদেশের ১৫ বছরের চুক্তির আওতায় বছরে ৪০টি কার্গো সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমান Brent মূল্যের ভিত্তিতে সেই গ্যাসের আনুমানিক মূল্য প্রায় $11.70/ Mambtu

অন্যদিকে, বর্তমান তারেক রহমান সরকার আমেরিকান কোম্পানি Gunvor-এর সঙ্গে নতুন চুক্তির প্রথম পর্যায়ে—২০২৬ থেকে ২০২৮ পর্যন্ত ১৪টি কার্গোর দাম নির্ধারিত হয়েছে JKM + $0.0875/MMBtu ভিত্তিতে। ১৬–১৭ আগস্টের বাজারদর ব্যবহার করলে এর কার্যকর মূল্য প্রায় $21.30/MMBtu।

অর্থাৎ, বর্তমান বাজারদরের ভিত্তিতে তুলনা করলে কাতারের LNG-এর আনুমানিক $11.70-এর বিপরীতে Gunvor-এর প্রাথমিক তিন বছরের LNG-এর মূল্য প্রায় $21.30—প্রতি MMBtu-তে পার্থক্য প্রায় $9.60।

এটি কোনো ছোট পার্থক্য নয়।

এখানেই চুক্তিটির দ্বিতীয় দিকটি সামনে আসে।

Gunvor মোট ১১৭টি LNG কার্গো ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে সরবরাহ করবে। প্রথম ১৪টি কার্গো ২০২৬–২০২৮ সালে JKM-ভিত্তিক। এরপর ২০২৮ সালের আরও তিনটি এবং ২০২৯–২০৩৮ সালে প্রতি বছর ১০টি করে কার্গো Henry Hub-ভিত্তিক দামে সরবরাহ করা হবে।

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কিছু পুরোনো চুক্তি Brent-ভিত্তিক হওয়ায় বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সেগুলোর দাম প্রায় $10.93–$12.32/MMBtu-এর মধ্যে পড়ছে। সেই তুলনায় JKM-ভিত্তিক Gunvor LNG অনেক বেয়বহুল জনগণকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সৃষ্টি করে কেন প্রায় দ্বিগুণ দামে LNG কিনছে। এখন দেখি সরবরাহকারী কোম্পানি Gunvor-এর অতীত ব্যবসায়িক দুর্নীতির ইতিহাস।

২০২৪ সালে Gunvor যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে Ecuador-এর রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি Petroecuador-এর ব্যবসা পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষ স্বীকার (guilty plea) করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, Gunvor-এর এই ঘুষকাণ্ডে Ecuador-এর সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করতে intermediaries-এর মাধ্যমে অর্থ প্রদান করা হয়েছিল। মার্কিন আদালত Gunvor-কে $374.56 million criminal penalty এবং প্রায় $287.14 million forfeiture দিতে নির্দেশ দেয়—মোট $661 million-এরও বেশি।

একই মামলায় সুইজারল্যান্ডের কর্তৃপক্ষও Gunvor-কে প্রায় CHF 86.7 million, অর্থাৎ আনুমানিক $98 million, জরিমানা করেছিল; মার্কিন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সেই অর্থের জন্য credit-এর ব্যবস্থাও ছিল।

অতএব, Gunvor-এর অতীত দুর্নীতির ঘটনা একটি প্রমাণিত আইনি ইতিহাস—এটি কোনো গুজব বা রাজনৈতিক অভিযোগ নয়।

তাহলে যে LNG সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণসহ বিচার হয়েছে এবং জরিমানা হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমাদের দেশে শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার চুক্তির চেয়ে দুই গুণ দামে LNG কিনে কত বিলিয়ন ডলার দুর্নীতি করেছে তারেক রহমানের সরকার , তা বুঝতে অসুবিধা হবে না।

একটি রাষ্ট্র যখন শত শত কোটি ডলারের জ্বালানি চুক্তি করে, তখন সরবরাহকারী কোম্পানির অতীত compliance history, corporate governance এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে যাচাই করা দরকার.যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ আছে এবং প্রমানিত সেই প্রতিষ্টার সাথে কার স্বার্থে এতবড় চুক্তি করা হয়েছে.এখানে যে দুর্নীতিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে তাহা বলাই বাহুল্য, এই চুক্তির দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সেটা বলা কোনো উপায় নেই, একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—শুধু আওয়ামী লীগ আমলের কাতার চুক্তি আর বর্তমান Gunvor চুক্তির headline price পাশাপাশি বসিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যথেষ্ট নয়।এই ব্যবধানের ব্যাখ্যা জনগণ পাওয়ার অধিকার রাখে। যদি LNG-এর দাম বেশি হয়, তার বোঝা বহন করবে বাংলাদেশের জনগণ—বিদ্যুতের বিলের মাধ্যমে, শিল্পের উৎপাদন খরচের মাধ্যমে, পণ্যের দামের মাধ্যমে এবং রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপের মাধ্যমে।

আর জনগণের এখন মূল্যায়ন করার সময় এসেছে—১৫ বছরের শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কতটা এই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করেছে।

২০২৪ এর ৫ই আগস্টের পরে ইউনুস ও বর্তমান তারেক সরকারের আমলে শুধু LNG বা বিদ্যুৎ নয়, সকল ক্ষেত্রে আজ অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির মহাউৎসব চলছে। তার পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে এই দেশের জনগণকে।

লেখক: শচীন বাঙালি,কলামিস্ট ও রাজনৈতি বিশ্লেষক