বিদেশি মিশন ঘিরে নিরাপত্তা শঙ্কা, স্থানান্তরিত হতে পারে অন্য দেশে
ঢাকায় অবস্থিত একাধিক বিদেশি কূটনৈতিক মিশনে হুমকি দিয়ে পাঠানো সাম্প্রতিক ইমেইলগুলো বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়; এটি দেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং বৈশ্বিক ভাবমূর্তির জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। চিন, রাশিয়া, তুরস্ক ও অন্যান্য মিশনে চাঁদা দাবি ও বোমা হামলার এই হুমকির নেপথ্যে 'ফেক গ্রুপ' বা ভুয়া প্রতারক চক্র জড়িত থাকার কথা পুলিশ উল্লেখ করলেও, বৈশ্বিক মহলে এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। চীন, জাপান ও যুক্তরাজ্যের মতো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশীদারদের পক্ষ থেকে তাঁদের পেশাজীবীদের ২৭ আগস্টের মধ্যে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশের খবর যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের সার্বিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করবে।
রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে সম্ভাব্য বহুমুখী প্রভাব
• অন্তর্বর্তী বা বর্তমান সরকারের ওপর চাপ ও আস্থা সংকট: বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতার প্রশ্ন উঠলে তা বর্তমান প্রশাসনের প্রশাসনিক সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। "দিল্লি না ঢাকা" জাতীয় রাজনৈতিক স্লোগানের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় বা জনমতে আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিল, বাস্তব সংকটে তাদের কার্যকর ভূমিকার অভাব তীব্র রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ও সমালোচনার মুখোমুখি করবে। •
• ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে রূপান্তর: পশ্চিম ও পূর্বের মিত্র দেশগুলো (যেমন যুক্তরাজ্য, চীন ও জাপান) যদি নিরাপত্তা শঙ্কায় নিজেদের কর্মকর্তা ও বিনিয়োগ গুটিয়ে নেয়, তবে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন থমকে দাঁড়াবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক পরাশক্তির ওপর বাংলাদেশের রাজনৈতিক নির্ভরশীলতা কমানোর যে চেষ্টা চলছিল, এই নিরাপত্তাহীনতা সেটিকে আবার পুরোনো বা দুর্বল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে ঠেলে দিতে পারে।
• ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা ও জনগণের ভোগান্তি: বিদেশি মিশনগুলো কার্যক্রম সীমিত বা স্থানান্তর করলে ভিসা সংক্রান্ত কাজ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশিদের ভারতের দিল্লি বা অন্য পার্শ্ববর্তী দেশে যেতে হবে। চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা ও ব্যবসার ক্ষেত্রে খরচ ও অনিশ্চয়তা বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করবে এবং এই সামাজিক ক্ষোভ পরবর্তীতে রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।
• বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক ধাক্কা: জাপান ও চীনের মতো দেশগুলোর কারিগরি ও মেগা প্রজেক্টের বিশেষজ্ঞরা ফিরে গেলে মেগা প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়বে। ফলে অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেবে, যা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
আতঙ্ক না ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ধরনের সাইবার হামলা ও হুমকির উৎস দ্রুত ও কঠোর অনুসন্ধানের মাধ্যমে শনাক্ত করতে হবে। কূটনৈতিক অঙ্গনে (গুলশান-বারিধারা) নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা জোরদার করে এবং ঘটনার নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের আওতায় এনে বিশ্বের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছানো জরুরি—বাংলাদেশের মাটি কূটনীতিকদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। রাজনৈতিক চটকদার স্লোগানের চেয়ে এই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক আস্থা পুনরুদ্ধারই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)