রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

অগ্নিকন্যা ও রাজনীতির ফিনিক্স পাখি: ইতিহাসের রাজপথে শেখ হাসিনা

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন। প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ৪:০৫ পিএম
অগ্নিকন্যা ও রাজনীতির ফিনিক্স পাখি: ইতিহাসের রাজপথে শেখ হাসিনা

জীবনপ্রদীপের ৭৮টি বসন্ত পেরিয়ে আসা এক মহিয়সী নারী—যার দীর্ঘ পথচলা কেবল জীবনের হিসাব নয়, বরং একটি দেশের ইতিহাস গড়ে তোলার রক্তস্নাত রূপকথা। জীবনের দীর্ঘ ২১টি বছর তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রনেতা হিসেবে মেধা ও দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা নারী সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর নাম সোনালী অক্ষরে লেখা হয়ে গেছে। আরব নিউজের ভাষায় যা ফুটে উঠেছিল—"Bangladesh dynamic leap Sheikh Hasina's landmark fifth term."

টাইম ম্যাগাজিনের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় ৩০তম স্থানে থাকা কিংবা ১৪ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে বুকে টেনে নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় "মাদার অফ হিউম্যানিটি" উপাধিতে ভূষিত হওয়া কেবল কিছু পদক নয়, এগুলো তাঁর মানবতাবাদী সত্তার চরম স্বীকৃতি। বিখ্যাত কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী যথার্থই বলেছিলেন, "আমার বিশ্বাস, হাসিনার শাসনামল একদিন অতীতের হোসেনশাহী শাসনামলীর মতো বাংলার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে সংযুক্ত হবে।" বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার কর্মী ও শিক্ষাবিদ রিচার্ড ও ব্রায়ান তাঁর ‘উইমেন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড প্রাইম মিনিস্টার’স’ গ্রন্থে যে সাতজন আলোড়ন সৃষ্টিকারী নারী রাষ্ট্রপ্রধানের জীবনগাথা তুলে ধরেছেন, শেখ হাসিনা তাঁদের অন্যতম। ২০১১ সালে বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় সপ্তম স্থান কিংবা ফরেন অ্যাফেয়ার্সের সেরা ১০০ চিন্তাশীল মানুষের তালিকায় ১৩তম অবস্থান তাঁর প্রজ্ঞাকেই প্রমাণ করে। ‘পিপলস্ অ্যান্ড পলিটিক্স’-এর জরিপে বিশ্বজুড়ে তৃতীয় সৎ রাষ্ট্রপ্রধানের স্বীকৃতি অর্জন কিংবা মেলবোর্নের ডেকিন ইউনিভার্সিটির জরিপে ‘মানবতার চ্যাম্পিয়ন’ হওয়া—এক জীবনে একজন রাষ্ট্রনেতার জন্য এরচেয়ে বড় পাওয়ার আর কী হতে পারে!

কিন্তু এই রাজকীয় মুকুটের নিচে জমে থাকা কষ্টের ইতিহাস কি আমরা জানি? প্রধানমন্ত্রীত্ব ছাড়িয়ে তাঁর রাজনীতির মূল শিকড় পাতা রয়েছে ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজপথের ধুলোবালিতে। ১৯৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয় দফা থেকে এক জীবনের সমান আত্মত্যাগ তিনি করেছেন পিচঢালা পথে। দীর্ঘ ২১ বছরের হাহাকার শেষে পিতৃহত্যার বিচার করেছেন; চার দশক পর জার্মানির নূরেমবার্গ ট্রায়ালের আদলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রায়াল গঠন করে চিহ্নিত রাজাকারদের বিচার নিশ্চিত করেছেন। জিয়া, এরশাদ ও মঈন ইউ আহমেদের মতো তিনটি সামরিক শাসনের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রাজপথের আন্দোলন বাঁচিয়ে রেখেছেন, সয়েছেন ছয় বছরের নির্বাসন যন্ত্রণা। সেই নির্বাসিত জীবনের করুণ আখ্যান ফুটে উঠেছে ‘আ ডটার'স টেল’ চলচ্চিত্রে। কত দিন কত রাত হাঁটুপানিতে নেমে বন্যার্ত মানুষের দুয়ারে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন তিনি! ২১ বার মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে আসা এমন অগ্নিকন্যা পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে ক'জন আছেন?

৭৮ বছরের এই বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি লাভ করেছেন ৫৪টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। বস্টন, ওয়াসেদা, বিশ্বভারতী কিংবা ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বের নামজাদা বিদ্যাপীঠগুলো তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত করে নিজেরাও সম্মানিত হয়েছে।

মাত্র ৩৩ বছর বয়সে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ ৪৫ বছর তা নিষ্ঠার সাথে বহন করা এক বিরল দৃষ্টান্ত। ১৯৯৬ সালে প্রথম সরকার গঠনের মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’ সম্পাদন করে তিনি পাহাড়ের দু'দশকের রক্তপাতের সমাপ্তি ঘটান—যা তাঁর পূর্বসূরীরা কেউ করতে পারেননি। তাঁর সূযোগ্য নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডানা মেলে—লাভ করে ওয়ানডে ও টেস্ট স্ট্যাটাস। ১৯৯৯ সালে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে অর্জন করেন "সেরেস পদক", আর একই বছর বাঙালির রক্তের রক্তিম একুশে ফেব্রুয়ারিকে এনে দেন ইউনেস্কোর 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'-এর ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক মর্যাদা।

দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রামের প্রতীক নেলসন ম্যান্ডেলার পর তিনি ভূষিত হন ‘টেগর শান্তি পুরস্কার’-এ, অর্জন করেন ইউনেস্কোর ‘হুপে-বোয়ানি’ ও ‘শান্তির বৃক্ষ’ পদক। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়াল সন্তোষ যে কাজের জন্য নোবেল পেলেন, তার ১৯ বছর আগেই পার্বত্য শান্তি চুক্তি করেও শেখ হাসিনা তা পাননি। কিন্তু এতে তাঁর মহত্ত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি; বরং নোবেল কমিটির এই দ্বিচারিতা বিশ্বরাজনীতিতে এক লজ্জাজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল। মহাত্মা গান্ধী বা ভ্লাদিমির লেনিনের মতো শেখ হাসিনাও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন, নিজের নীতি ও আদর্শের সাথে আপস করেননি।

শেখ হাসিনার সমালোচনা করা হয়তো খুব সহজ, কিন্তু আরেকজন শেখ হাসিনা হয়ে উঠতে হাজারবার জন্ম নিতে হবে। তিনি কেবল সফল রাষ্ট্রনায়ক নন, একজন রত্নগর্ভা মা-ও বটে। তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, হার্ভার্ড এবং ব্যাঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়া এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আর তাঁর প্রয়াত স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া ছিলেন বিশ্বমানের পরমাণু বিজ্ঞানী ও বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞান গ্রন্থের লেখক। যোগ্যতার এমন অনন্য উচ্চতায় আসীন পরিবার সমগ্র দেশে আর দ্বিতীয়টি মেলা ভার!

সর্বোপরি, তাঁর সবচেয়ে বড় ও চিরন্তন পরিচয়—তিনি "বঙ্গবন্ধুর মেয়ে"। যে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ রেজিস্টারে অমর হয়ে আছে, যিনি এই জাতির প্রতিষ্ঠাতা—সেই মহারথীর সন্তান হওয়া একজন কন্যার জন্য পৃথিবীর সর্বোচ্চ গৌরব।

শেখ হাসিনা আজ দেশ ও কালের সীমানা ছাড়িয়ে এক অনন্য উচ্চতায়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো কিংবা যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের মতো বিশ্বনেতারা যেভাবে তাঁকে সম্মান জানিয়েছেন, তা যেকোনো রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য স্বপ্নের মতো। রাজনীতির চক্রান্তে তাঁকে নিয়ে ছক আঁকা সহজ, কিন্তু ইতিহাসে তাঁর অবদান মুছে ফেলা অসম্ভব। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় তাঁর অবস্থান প্রমাণ করে—সম্মান ভিক্ষা করে নেওয়া যায় না, তা অর্জন করে নিতে হয় ("Respect is not given, it's earned")। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রের ইতিহাসে, পাঠ্যপুস্তকের পাতায় রাজনীতির এই মহীয়সী ‘ফিনিক্স পাখি’ অমর হয়ে থাকবেন।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।