রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

রক্তে কেনা লাল-সবুজের ডাক: স্বাধীনতাবিরোধীদের নতুন সংকেত এবং আমাদের দায়

লিখেছেন: নীহারিকা রায়, উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ৪:০৮ পিএম
রক্তে কেনা লাল-সবুজের ডাক: স্বাধীনতাবিরোধীদের নতুন সংকেত এবং আমাদের দায়

২০২৬ সালের ২৩ আগস্ট—স্থান কাকরাইলের আইডিইবি মিলনায়তন। সেখানে দাঁড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করলেন এক চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান কোনো ‘ফাইনাল যুদ্ধ’ ছিল না; তা ছিল নাকি কেবলই এক ‘রিহার্সাল’ বা মহড়া! ঠিক যেমন সেনাবাহিনী মূল যুদ্ধের আগে মহড়া চালায়, চব্বিশের আন্দোলনও নাকি ছিল তেমনই এক প্রস্তুতি। তিনি হুংকার দিয়ে বললেন, সেদিন যেসব মানুষ জেগে উঠেছিল, তারা মরে যায়নি, ঘুমিয়েও পড়েনি—তারা সজাগ।

এই একটি মাত্র বক্তব্যই উন্মোচিত করে দিয়েছে স্বাধীনতাবিরোধীদের নতুন ও ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের সংকেত। এ কথা শুনে কেউ হয়তো শঙ্কিত, কিন্তু ১৯৭১-এর রক্তঝরা চেতনায় বেড়ে ওঠা প্রবীণ প্রজন্ম এবং তাঁদের সন্তানেরা আজ এক দীপ্ত আহ্বানের অপেক্ষায় উন্মুখ। কারণ, বুক উজাড় করে ভালোবাসা এই দেশমাতৃকাকে যদি আবারও বিষাক্ত হায়েনাদের কবল থেকে রক্ষা করতে হয়, তবে রক্তে ভেজা রাজপথে নামতে আমরা এক মুহূর্তও দ্বিধা করব না।

মনে প্রশ্ন জাগে—জামায়াত আজ এত স্পর্ধা পায় কোথায়? উত্তর পেতে হলে ইতিহাসকে একটু পেছন থেকে দেখতে হবে। ছদ্মবেশ ও সুবিধাবাদের রাজনীতিতে এই দলটি বড্ড সিদ্ধহস্ত। প্রতিকূল পরিবেশ পেলেই তারা অন্যের ছায়াতলে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে, আর সুযোগ এলেই প্রকাশ করে নিজেদের বিষাক্ত ছোবল। স্বাধীনতার পরপর জাসদের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেওয়া থেকে শুরু করে, সময় বুঝে কখনো বামপন্থী, কখনো আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির ছায়ায় মিশে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তারা। এমনকি দলটির বর্তমান আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল—দুজনেই ১৯৭৩ সালে ইসলামী ছাত্রসংঘ থেকে জাসদ ছাত্রলগে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই রূপান্তরিত নেতারাই জামায়াতের টিকিটে সংসদে গিয়ে বসেছেন, নতুন দল গড়েছেন এবং গোপনে উগ্রপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীকে অর্থ ও লোকবল যুগিয়েছেন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হরকাতুল জিহাদ (হুজি)-এর হাত ধরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও উগ্রবাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে এর সবচেয়ে নৃশংস রূপ প্রকাশ পায় ২০০১ সালের পর। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) চোখের পলকে দেশের ৬৩টি জেলায় প্রায় ৫০০টি স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে পুরো দেশকে থমকে দিয়েছিল। তারও আগে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৪টি তাজা প্রাণ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যে হত্যাযজ্ঞে শীর্ষ জামায়াত নেতাদের নাম স্পষ্টভাবে উঠে আসে। ২০১৬ সালে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ২০ জন বিদেশী নাগরিকসহ নিরীহ মানুষদের নৃসংসভাবে হত্যা করার ক্ষত আজও প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের বুকে তাজা।

আইনি প্রমাণের ফাঁকফোকরে হয়তো সর্বদা প্রতিটির সাথে সরাসরি দলীয় সিলমোহর লাগান যায়নি, কিন্তু এই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো যে জামায়াতেরই রাজনৈতিক ও আদর্শিক পকেট থেকে উৎসারিত, তা সর্বজনবিদিত। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সংঘটিত অন্তত ৩৭টি ভয়াবহ হামলার ক্ষতচিহ্ন বহন করছে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নথি।

আর ১৯৭১? সে তো এক সীমাহীন বেদনার মহাকাব্য। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহায়তায় রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গঠন করে এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা, গণহত্যা, নারী নির্যাতন ও লুণ্ঠনের যে অমানবিক উৎসব তারা চালিয়েছিল, তার চরম মূল্য দিতে হয়েছে মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মতো অপরাধীদের, যাদের বিচারে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে প্রতিপক্ষের হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়ার যে বর্বরোচনা সংস্কৃতি তারা চালু করেছিল, তা ভাবলেও আজও গা শিউরে ওঠে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও নির্বাচনকে ঘিরে ২০১৩-১৪ সালে সারা দেশে অগ্নিসংযোগ, পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ এবং গণপরিবহনে আগুন দিয়ে জ্যান্ত মানুষদের ঝলসে মেরে ফেলার সেই স্মৃতি আজও আমাদের কাঁদায়।

আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বারবার প্রকাশ পেয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মতো উগ্রপন্থী সংগঠনের সাথে জামায়াতের একংশের গভীর আদর্শিক ও আর্থিক লেনদেন রয়েছে। সেই সত্য আবার প্রকাশ্যে আসে ২০২২ সালের ৯ নভেম্বর, যখন সিলেট থেকে ডা. শফিকুর রহমানের আপন ছেলে ডা. রাফাত সাদিক সাইফুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছিল, তিনি ছিলেন নিষিদ্ধ আনসার আল ইসলাম ও জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়ার সিলেট অঞ্চলের প্রধান সমন্বয়ক!

সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও মুক্তচিন্তার মানুষের ওপর তাদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন আমাদের ইতিহাসকে বারবার কলঙ্কিত করেছে। ২০১৫-১৬ সালে বেছে বেছে হিন্দু ধর্মগুরু ও পুরোহিতদের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হয়। পঞ্চগড়ে যজ্ঞেশ্বর রায়কে গলা কেটে হত্যা, ঝিনাইদহে আনন্দগোপাল গাঙ্গুলী ও পাবনায় নিত্যরঞ্জন পাণ্ডেকে নৃশংসভাবে খুন করা—প্রতিটি ঘটনায় কেঁদেছে বাংলাদেশ। কিশোরগঞ্জের ইসকন মন্দিরে বোমা, আহমাদিয়া মসজিদে আক্রমণ, শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলা, বৌদ্ধ বিহারে অগ্নিসংযোগ আর খ্রিস্টান চার্চে বোমা হামলা—এ সবই সেই একই অন্ধকার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। কারামহাপরিদর্শকের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় চরম বিশৃঙ্খলার সুযোগে ৯ জন ভয়ংকর জঙ্গি কারাগার থেকে পালিয়ে যায়, যাদের মধ্যে এখনো কয়েকজন ধরাছোঁয়ার বাইরে। একই সাথে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতায় অভিযুক্ত প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক ব্যক্তি জামিনে মুক্ত হয়ে উধাও হয়ে গেছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দীর্ঘ এক দশক ধরে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে এই উগ্রপন্থীদের শক্ত হাতে দমন করে রেখেছিল। ফলে তাদের আস্তানাগুলো ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। কিন্তু আজ আবার তাদের সেই ছায়া ঘনিয়ে আসছে। বিভিন্ন বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করছে, প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ছোট-বড় চরমপন্থী দল গোপনে আবার একত্রিত হচ্ছে, নিচ্ছে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ।

এমতাবস্থায়, ডা. শফিকুর রহমানের ‘রিহার্সাল’ সংক্রান্ত হুমকি কেবল কোনো আলগা রাজনৈতিক বয়ান নয়। এটি তাঁদের সেই রক্তাক্ত অতীতকে ফিরিয়ে আনার এক নতুন হুংকার। যারা ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লাখ শহীদ আর ২ লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগকে বুকে ধারণ করেন, তাঁদের জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষার চরম সতর্কবার্তা। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ‘সরকার উৎখাতের জঙ্গি আন্দোলন’কে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করার যে ঐতিহাসিক ভুল হতে চলেছিল, তার পুনরাবৃত্তি আর হতে দেওয়া যায় না।

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি, আমাদের বাংলাদেশ আজ আবারও চরম সংকটে। এই বিষাক্ত থাবার সামনে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা আর আত্মহত্যার শামিল। রাজপথে, চিন্তায় এবং শক্ত হাতে—সবস্তরে এই স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে উৎখাত করতেই হবে। দেশমাতৃকার আহ্বানে সাড়া দেওয়ার সময় এখনই!

লেখক: নীহারিকা রায়, উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট