কার স্বার্থে মুক্ত জঙ্গিরা: রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা ও জাতীয় নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশে উগ্রবাদী ও জঙ্গি তৎপরতা কি নতুন করে ডালপালা মেলছে—এই প্রশ্নের সত্যানুসন্ধান করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন রাষ্ট্রের নীতি ও অবস্থানের স্বচ্ছতা মূল্যায়ন করা। জঙ্গি ইস্যুটিকে কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে দেখলে আসল সংকট অধরাই থেকে যাবে। এখানে মূল চ্যালেঞ্জটি রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত অস্বীকারের কৌশল এবং প্রকৃত তথ্যের হিসাব আড়াল করার সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত। দৃশ্যমান বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখা মানে চরম ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়েও সুরক্ষার মিথ্যা আশ্বাসে বুঁদ হয়ে থাকা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো দেশের প্রধান কারাগারগুলো থেকে অপরাধীদের মুক্তি ও বিচ্যুতির পরিসংখ্যান। দেশের বিভিন্ন কারাফাটক থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উগ্রবাদী আসামি আইনি ফাঁকফোকর বা পরিস্থিতির সুযোগে বেরিয়ে গেছে। এমনকি জেল ভেঙে পালানো বেশ কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গি নেতা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কারাগারের গুরুত্বপূর্ণ নথি ধ্বংস হওয়া বা তথ্যের ঘাটতির কারণে পালিয়ে যাওয়া অনেকের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করাও সম্ভব হয়নি। যখন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট পরিচয় সম্পর্কেই নিশ্চিত হতে পারে না, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করা রাষ্ট্রের এক ধরনের আত্মতুষ্টি বৈ কিছু নয়।
জামিনে মুক্ত হওয়া বা পলাতক ব্যক্তিদের বর্তমান কার্যক্রম রাষ্ট্রের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। আল কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)-এর মতো বিপজ্জনক সংগঠনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে যুক্ত এবং ডিজিটাল মাধ্যমে মতাদর্শ প্রচারে দক্ষ ব্যক্তিরা জামিন পাওয়ার পর নিখোঁজ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, অতীতে ভয়াবহ বোমা হামলায় অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীরা মুক্ত হয়ে পুনরায় উগ্রবাদী নেটওয়ার্কে সক্রিয় হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর আসছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে বিস্ফোরক উদ্ধার ও গোপন আস্তানার সন্ধান মেলা প্রমাণ করে যে, এই গোষ্ঠীগুলো একদম নিষ্ক্রিয় নয়। আইনি খালাস বা জামিনের প্রক্রিয়ায় গোয়েন্দা নজরদারির যে সুস্পষ্ট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, তা জাতীয় নিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের মূল্যায়নও একই ধরণের সতর্কবার্তা দিচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং টিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠনগুলো বর্তমানে ছোট ছোট বিকেন্দ্রীভূত সেলে ভাগ হয়ে নিজেদের আর্থিক ও লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। আঞ্চলিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন করে শক্ত ঘাঁটি গড়ার অপচেষ্টা স্পষ্ট। প্রতিবেশী দেশগুলোতে সংঘটিত বিভিন্ন উগ্রবাদী ঘটনার দায় যখন এসব আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী স্বীকার করে, তখন দেশীয় প্রেক্ষাপটে তাদের অস্তিত্বকে স্রেফ 'অনুমাননির্ভর' বলে উড়িয়ে দেওয়া কৌশলগত ভুল।
এই পুনরুত্থানের পেছনে কেবল উগ্র আদর্শিক টান কাজ করছে তা নয়, বরং ক্ষমতার পট পরিবর্তনজনিত বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী মানসিকতাও একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক নেতৃত্বহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগে এসব গোষ্ঠী তাদের নেটওয়ার্ক নতুন করে পুনর্বিন্যাস করেছে।
একই সঙ্গে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উগ্রবাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশায় কিংবা নির্দিষ্ট জোটবদ্ধতার কারণে উগ্রপন্থী আদর্শকে প্রশ্রয় দেওয়ার যে ইতিহাস রয়েছে, তা জঙ্গি দমনের আন্তরিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি কোনো প্রশাসন কেবল নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে বেছে বেছে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তবে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল ভিত্তিটিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটগুলোর আনুষ্ঠানিক 'মনিটরিং'-এর দাবি কেবল খাতাকলমে সীমাবদ্ধ থাকলে তা সুফল আনবে না। কার্যকর জঙ্গি দমনের জন্য প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সর্বাত্মক গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রশাসনিক দ্বৈতনীতি পরিহার করা। অস্বীকারের রাজনীতি ত্যাগ করে বাস্তবতার মুখোমুখি না হলে এই পুনরুত্থান জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
রাজনীতিতে ভারত-বিদ্বেষ, ব্যাকস্টেজে সহযোগিতা: বাংলাদেশ-ভারত কূটনীতিতে দ্বিমুখী আচরণ ও এর সম্ভাব্য ঝুঁকি
রাজনীতিতে ভারত-বিদ্বেষ, ব্যাকস্টেজে সহযোগিতা: বাংলাদেশ-ভারত কূটনীতিতে দ্বিমুখী আচরণ ও এর সম্ভাব্য ঝুঁকি
‘প্রতিবেশীরা শুধু ভারতের স্বার্থেই কাজ করবে, এমন আশা রাখি না’! পাকিস্তান, বাংলাদেশ, চিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বড় বার্তা জয়শঙ্করের