বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনের অব্যাহতির সুপারিশ: জুলাই অভ্যুত্থানে ভুয়া মামলার চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন

✍ লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ৫:১৭ পিএম
শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনের অব্যাহতির সুপারিশ: জুলাই অভ্যুত্থানে ভুয়া মামলার চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন

কথিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে রাজপথের প্রতিটি রক্তবিন্দু এবং পুলিশের গুলিতে আহত কিংবা শহীদদের আত্মত্যাগ সমগ্র জাতির কাছে এক প্রশ্নবোধ চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত । এই সুযোগকে পুঁজি করে এবং ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করতে কিছু অসাধু চক্রের ভুয়া মামলার প্রবণতা বিচারব্যবস্থার সামনে এক নতুন মানবিক ও নৈতিক সংকট তৈরি করেছে।

সম্প্রতি জুলাই অভ্যুত্থানে শরীরে নয়টি গুলিবিদ্ধ হওয়ার কাল্পনিক ও বানোয়াট দাবি করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনকে অভিযুক্ত করার চাঞ্চল্যকর মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। নিবিড় তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, বাদী নূর হোসেনের গায়ে একটি গুলি লাগা তো দূরের কথা, ঘটনার দিন তিনি ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন না এবং কোনোভাবেই আহত হননি। এই ঘটনা কেবল একটি মিথ্যা মামলার জালিয়াতীই উন্মোচন করেনি, বরং এটি বিচারপ্রার্থী প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অধিকার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে কতটা কণ্টকাকীর্ণ করে তুলছে, তারও এক নির্মম চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।

ভুয়া মামলার আদ্যোপান্ত: যেভাবে সাজানো হয়েছিল নাটক

গত বছরের (২০২৪) ১ ডিসেম্বর ঢাকার আদালতে দায়ের করা মামলার এজাহারে মোহাম্মদপুরের বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় ৪ আগস্টের একটি মর্মান্তিক ( কথিত ) চিত্র তুলে ধরেছিলেন বাদী নূর হোসেন। তাঁর দাবি ছিল, সেদিন গণআন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় নির্বিচার হামলায় তাঁর পিঠে ছয়টি, বাঁ হাঁটুর ওপরে দুটি এবং ডান হাঁটুর পাশে একটিসহ মোট নয়টি বুলেটবিদ্ধ হয়। এমনকি আসামিরা তাঁকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ভয়ের কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়—এমন চাঞ্চল্যকর অভিযোগও আনা হয়েছিল।

তবে মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) উক্যমং রাখাইনের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই বিবৃতির সম্পূর্ণ সত্যতা ধুলিসাৎ হয়ে যায়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। সম্প্রতি আদালত নথি পর্যালোচনা করে বাদীর প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির আদেশ দেন এবং আগামী ১ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

জাল চিকিৎসাপত্র ও নথিপত্রের প্রতারণা

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাদী নূর হোসেন এজাহারের সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের যে ব্যবস্থাপত্র ও কাগজপাতি জমা দিয়েছিলেন, তার পুরোটাই ছিল জালিয়াতির ফসল। হাসপাতালের মূল রেজিস্ট্রার ও রেকর্ডপত্র যাচাই করে প্রমাণিত হয় যে, উল্লিখিত তারিখে নূর হোসেন নামের কেউ সেখানে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি।

প্রতিবেদনে জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট দুটি অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে: ১. সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা সর্বদা নিজ হাতে ব্যবস্থাপত্র লেখেন, অথচ নূর হোসেনের দাখিলকৃত নথিটি ছিল কম্পিউটারে টাইপ করা। ২. চিকিৎসাপত্রে ব্যবহৃত ক্যাশ মেমো নম্বরটি ছিল ৫৪ বছর বয়সী 'আব্দুস সাত্তার' নামের ভিন্ন এক রোগীর এবং রোগীর আইডি নম্বরটি ছিল ৩২ বছর বয়সী 'জুয়েল' নামের অন্য একজনের।

তাছাড়া, জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকাশিত কোনো দাপ্তরিক গেজেটেও নূর হোসেনের নামের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

দায়মুক্তির সুপারিশ ও আইনি প্রেক্ষাপট

তদন্তে অভিযোগের বিন্দুমাত্র সত্যতা না পাওয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৮৪ জন আসামিকে সম্পূর্ণ অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এই তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, ছাত্রনেত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ। যদিও মামলার পর বিভিন্ন আসামিকে অন্য মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট বা গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল।

রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার এই অপচেষ্টার দায়ে বাদীর বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি আইনি পদক্ষেপ পুলিশ নেয়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তবে আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এবং ভবিষ্যতে কেউ যাতে ব্যক্তিগত স্বার্থে বিচারব্যবস্থাকে হাতিয়ার বানাতে না পারে, সে বিষয়ে আদালতের পক্ষ থেকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বিচারপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার ও মানবিক দায়বদ্ধতা

আইন ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ভুয়া ও মনগড়া মামলা দায়ের কেবল বিচার বিভাগীয় জটই বাড়াচ্ছে।

একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো অপরাধের সঠিক বিচার যেমন অপরিহার্য, তেমনি বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ করে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়াও সমানভাবে জরুরি। এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আবেগকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা বিচারবহির্ভূত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত সত্যের আলোয় ধূলিসাৎ হতে বাধ্য। এখন দেখার বিষয়, আগামী ১ ডিসেম্বরের শুনানিতে আদালত এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে কী দৃষ্টান্তমূলক আদেশ প্রদান করেন।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: