মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

রক্তাক্ত ২১ আগস্ট ও লাল রক্তের শোক: আইভী রহমান—এক অমর আত্মত্যাগের মহাকাব্য

লিখেছেন: ড.আওলাদ হোসেন, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ছবি: অলোক মিত্র প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৩ এএম
রক্তাক্ত ২১ আগস্ট ও লাল রক্তের শোক: আইভী রহমান—এক অমর আত্মত্যাগের মহাকাব্য

বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি ত্যাগের রক্ত দিয়ে লেখা এক অমর দলিল। সেই দলিলে উজ্জ্বলতম এক নাম—আইভী রহমান। তিনি কেবল এক রাজনীতিক বা সমাজকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্নেহের ছায়া, সংগ্রামের রক্তগোলাপ এবং এক অনন্য সাহসী নারী, যাঁর জীবন শেষ হয়েছিল ইতিহাসের এক অত্যন্ত নৃশংস ও রক্তাক্ত অধ্যায়ে।

শৈশব ও মানবিক মূল্যবোধের সূচনা

১৯৩৪ সালের ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের ভৈরব নদীর হাওর-বাতাসে বড় হওয়া এই মহীয়সী নারী পারিবারিক সূত্রেই পেয়েছিলেন সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের শিক্ষা। বাবা জহুরুল হক ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। পিতার সেই মানবিক শিক্ষা আর মায়ের পরম স্নেহে বেড়ে ওঠা আইভী রহমান বাল্যকাল থেকেই ছিলেন চরম সংবেদনশীল। আর্তপীড়িত মানুষের কষ্ট দেখলে যাঁর চোখ জলে ভরে উঠতো, সেই কোমল হৃদয়ই পরবর্তীতে সংগ্রামের ময়দানে হয়ে উঠেছিল এক পর্বতের মতো দৃঢ়।

নারী সমাজ ও রাজনীতির এক দীপ্ত শিখা

আইভী রহমানের কাছে রাজনীতি কোনো ক্ষমতার সিঁড়ি ছিল না, রাজনীতি ছিল মানুষকে ভালোবাসার এক পবিত্র মাধ্যম। দীর্ঘদিন ধরে নারী সমাজকে সুসংগঠিত করা, সুবিধাবঞ্চিত নারীদের অধিকার রক্ষা করা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ নেত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তিনি বুকে ধারণ করেছিলেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। বিনয় ও দৃঢ়তার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ছিলেন তিনি—সহকর্মীদের কাছে এক স্নেহময়ী অভিভাবক।

মমতাময়ী সহধর্মিণী ও পারিবারিক জীবন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ও অনুকরণীয় দাম্পত্যের প্রতীক ছিলেন মো. জিল্লুর রহমান ও আইভী রহমান। সহধর্মিণী হিসেবে জিল্লুর রহমানের প্রতিটা রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি ছিলেন এক নিশ্চুপ কিন্তু শক্ত স্তম্ভের মতো। কঠিনতম সময়ে সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যেমন আগলে রেখেছেন, ঠিক তেমনই নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করে এ দেশের নারী সমাজের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিলেন।

২১ আগস্টের ভয়াল থাবা ও শেষ বিদায়

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট—ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আকাশ সেদিন থমকে গিয়েছিল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শান্তিসভায় মুহূর্তেই নেমে এসেছিল এক নারকীয় তাণ্ডব। ঘাতকদের নির্দয় গ্রেনেড হামলায় স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। বিকট শব্দ আর রক্তের ধোঁয়াটে অন্ধকারে ধূলিসাৎ হয়ে যায় বহু প্রাণ।

সেদিন ঘাতকের গ্রেনেড কেড়ে নিয়েছিল আইভী রহমানের দুটি পা। শরীরের রক্তে ভেসে যাচ্ছিল রাজপথ, তবুও তাঁর চোখে ছিল এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণা আর বেঁচে থাকার আকুতি। কিন্তু ঘাতকের বুলেট ও রক্তক্ষয় তাঁর জীবনদীপকে বেশিদিন টিকতে দিল না। চার দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে এক করুণ, নিদারুণ লড়াই শেষে ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট তিনি পাড়ি জমান চিরশান্তির দেশে।

শ্রদ্ধা ও অমর স্মৃতি

আইভী রহমানের মৃত্যু কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি নয়, এটি এক আদর্শের অমরতা। প্রতি বছর ২৪ আগস্ট এলে চারপাশের বাতাস যেন ভারি হয়ে ওঠে তাঁর স্মৃতির শোকে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর সীমাহীন ত্যাগ, সাহস ও ভালোবাসার গল্প।

তিনি আজও বেঁচে আছেন এই বাংলার মানুষের হৃদয়ে, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এবং ইতিহাসের পাতায়। আইভী রহমানদের মতো নিঃস্বার্থ প্রাণ কখনো মরে না—তাাঁরা যুগে যুগে প্রদীপ হয়ে আলো জ্বালান আমাদের চেতনায়। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: ড.আওলাদ হোসেন, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ছবি : অলোক মিত্র।