রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

দুই দশকের ক্ষত ও বিচারহীনতার হাহাকার: ২১ আগস্টের সেই রক্তাঙ্কিত দিন এবং স্বজনহারাদের অধরা ন্যায়বিচার

লিখেছেন: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫১ এএম
দুই দশকের ক্ষত ও বিচারহীনতার হাহাকার: ২১ আগস্টের সেই রক্তাঙ্কিত দিন এবং স্বজনহারাদের অধরা ন্যায়বিচার

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে রাজনৈতিক সমাবেশের ওপর চালানো হয় এক ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। মুহূর্তের মধ্যে রক্তের দাগে আর বীভৎসতায় ঢেকে যায় পুরো এলাকা। ওই হামলায় ২৪ জন প্রাণ হারান এবং গুরুতর আহত হন ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ। এই নির্মম ঘটনার পর দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও স্বজন হারানো পরিবারগুলোর বুকে জমানো শোক ও ন্যায়বিচারের আকুতি আজও পূর্ণতা পায়নি।

আইনি পরিক্রমা ও দীর্ঘ তদন্ত যাত্রা ঘটনার দিনই মতিঝিল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা করে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদে সিআইডি নতুন করে তদন্ত শুরু করে এবং ২০০৮ সালে বিএনপির নেতা আবদুস সালাম পিন্টু ও মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগপত্র পেশ করা হয়। ২০০৯ সালে সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে পুনরায় তদন্ত নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১১ সালে সম্পূরক চার্জশিটে আরও ৩০ জনকে যুক্ত করা হয়, যার ফলে মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২ জনে। তবে অন্য মামলায় কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের কারণে ৩ জন আসামির নাম বাদ পড়ে চূড়ান্ত আসামির সংখ্যা হয় ৪৯।

২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর নিম্ন আদালত ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ঘোষণা করে। কিন্তু সাজার রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ হাইকোর্টে আপিল করেন।

উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ ও খালাস রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের শেষভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে মামলার সব আসামিকে বেকসুর খালাস দেন। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, বিচারিক আদালতে কেবল দুর্বল ও শোনা সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে রায় দেওয়া হয়েছিল। কোন ব্যক্তি সরাসরি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছেন, তা প্রত্যক্ষদর্শী কোনো সাক্ষী নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। আদালত আরও জানান, মামলাটিতে অধিকতর তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়েছিল আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূতভাবে এবং সম্পূরক চার্জশিটটিও ছিল আইনিভাবে ত্রুটিপূর্ণ। মুফতি হান্নানের প্রত্যাহৃত স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হওয়াকে আদালত বেআইনি হিসেবে উল্লেখ করেন।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট এক মর্মস্পর্শী পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন। তারা এই ঘটনাকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য গণহত্যা উল্লেখ করে আইভি রহমানসহ সব নিহতদের স্মরণে একটি দক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। বিচার নিশ্চিত করার তাগিদে মামলাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুনরায় তদন্তের জন্য পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আপিল বিভাগ চূড়ান্ত বিচারে বাতিল করে দেয়।

আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া ও স্বজনদের অমীমাংসিত বেদনা আদালতের এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পরিণতি দেখে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ হতাশা প্রকাশ করে জানান, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সব আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হলেও প্রকৃত আসামিদের চিহ্নিত করার কোনো দিকনির্দেশনা আসেনি। এতে নিহত ও হতাহতদের স্বজনেরা ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হলেন।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির মনে করেন, রাজনৈতিক স্বার্থে যখন বিচারিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, তখন মূল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। যেকোনো শাসক দল ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের ইচ্ছেমতো মামলা সাজালে শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারগুলোই সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২২ বছর পর এসেও এই মর্মান্তিক ঘটনার সঠিক তদন্ত বা প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি না হওয়া আমাদের বিচার ব্যবস্থার সামনে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে। নিহতদের পরিবার এখনো চেয়ে আছে কেবল সত্য ও সুবিচারের আশায়।

লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।