রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

গণতন্ত্র নাকি উগ্রবাদ? এক বিপজ্জনক মোড়ে বাংলাদেশ — শেখ হাসিনা

লিখেছেন: শেখ হাসিনা, রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যা। বাংলা করেছেন - অশ্রু হাসি,রাজনীতিবিদ,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:০১ এএম
গণতন্ত্র নাকি উগ্রবাদ? এক বিপজ্জনক মোড়ে বাংলাদেশ — শেখ হাসিনা

বাংলা করেছেন অশ্রু হাসি (রাজনীতিবিদ,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

শান্তিপূর্ণ ও উদারপন্থি মুসলিম দেশ বাংলাদেশ আজ ধ্বংসের মুখে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মেয়াদে মাত্র ১৫ বছরে শূন্য থেকে দেশটি বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ সরকার মাত্র এক বছরেই এসব অর্জন ধ্বংস করে দিয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যান্য নিহত জাতীয় নেতা এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। পাকিস্তানি বাহিনীর দখলদারিত্ব থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে যারা সমর্থন জুগিয়েছিলেন, তারাও গভীর শ্রদ্ধার দাবিদার। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হলেও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নের যাত্রা মসৃণ ছিল না, বরং ছিল সংকটময় ও বিপজ্জনক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পুরো পরিবারকে নিঃশেষ করে দেওয়া হয়—জাতির পিতা, তাঁর স্ত্রী, তিন ছেলে এবং দুই পুত্রবধূসহ পরিবারের মোট ১৮ জন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান।

১৯৭৫ সালের পর দুই বোনকে ছয় বছর নির্বাসনে কাটাতে হয়। শেখ হাসিনা যখন দেশে ফেরেন, তখন তাঁর পরিবারের খুনিরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এবং তাদের বিচারহীনতার দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। বিচার চাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না; সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে ১৯৮১ সালে জনগণের সেবা করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করে। তিনি সভাপতি পদের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, তবে তা ছিল দলীয় নেতাকর্মীদের আকাঙ্ক্ষা। জাতির জন্য তাঁর পিতা ও পরিবার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ করাকে তিনি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন।

দীর্ঘদিন দেশটি সামরিক স্বৈরশাসকদের অধীনে ছিল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর হতো। তৎকালীন পরিস্থিতি ছিল এমনই। তাই লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, আঞ্চলিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা—যা ছিল বঙ্গবন্ধুরও স্বপ্ন। তিনি বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, গণতন্ত্র ও সম-নাগরিকত্বে বিশ্বাসী। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং সকল নাগরিকের জন্য এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলেন। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম সরকার গঠন করে। অগ্রাধিকার ছিল জনগণের সেবা করা। খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ম্ভর করে তোলা হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয় এবং স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার উন্নয়নে নেওয়া হয় নানা পদক্ষেপ। ইচ্ছা ছিল জনগণের জন্য কিছু করার। ২০০১ সালে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে ৪,৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয় এবং সাক্ষরতার হার ৬৫.৫%-এ দাঁড়ায়। অন্যান্য সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচকেও বিশাল অগ্রগতি অর্জিত হয়। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসতে পারেনি।

২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি-জমাত সরকারের অধীনে বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রপন্থার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। হরকাতুল জিহাদ, জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং অন্যান্য উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক লালিত-পালিত হওয়ার সুযোগ পায়, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী ছিল।

আট বছর পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণের জনাদেশ পেয়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং সন্ত্রাস দমনকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করে। ২০০৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়। সন্ত্রাসী অর্থায়ন, অর্থ পাচার, জঙ্গি নিয়োগ এবং চরমপন্থী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা হয়। সিটিটিসি, অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিট, বিএফআইইউসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থা ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। গোয়েন্দা সমন্বয় জোরদার করা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে জাতীয় সমন্বয় কাঠামো গঠিত হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল তৈরি করা হয়। ধর্মীয় পণ্ডিত, শিক্ষক, পরিবার, যুবক এবং সামাজিক নেতাদের সাথে কাজ করে এটি স্পষ্ট করা হয় যে কেবল শক্তি প্রয়োগ করে সন্ত্রাসবাদ দমন করা সম্ভব নয়; এর জন্য শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, ধর্মীয় সঠিক ব্যাখ্যা, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, সাইবার নজরদারি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ এক বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করে। কোটা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে মুহাম্মদ ইউনুসের পরিকল্পিত এক চক্রান্তের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সহিংস উগ্রপন্থীদের সক্রিয় অংশীদার, সংগঠক ও সুবিধাবাদী হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটিয়ে এই দুষ্কৃতকারীরা ৪৬০টি থানা পুড়িয়ে দেয়। বহু জায়গায় পুলিশ সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করে ওভারব্রিজে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

কারাগারে হামলা চালানো হয়। সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন জঙ্গিরা পালিয়ে যায় বা জামিনে মুক্ত হয়। আনসারউল্লাহ বাংলা টিম, হিজবুত তাহরীর, হরকাতুল জিহাদ এবং জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের মতো নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতাসহ জেলখানায় থাকা সব সন্ত্রাসী ও খুনিদের মুক্তি দেওয়া হয়।

হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, আহমদিয়া এবং সুফি মাজার ও দরগাহসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করা হয়। কেবল প্রতিষ্ঠানই নয়, সাধারণ মানুষও রেহাই পায়নি। এটি ছিল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর এক আঘাত।

উগ্রপন্থী নেতারা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। তাদের যুক্তি ছিল নৃশংস: লাশ ফেলো, জনক্ষোভ তৈরি করো, তাহলেই সরকারের পতন হবে। ড. ইউনুস, তারেক রহমান এবং জামায়াত এই উদ্দেশ্যেই আন্দোলন পরিচালনা করেছিল। এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না, বরং ছিল একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত।

প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি গুলিবর্ষণ এবং সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার তদন্তের জন্য ১৮ জুলাই একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ড. ইউনুস ও তাঁর শাসকগোষ্ঠী যদি সত্যিই বিচার চাইতেন, তবে কেন সেই তদন্ত স্থগিত করা হলো? কেন তারা একটি স্বাধীন তদন্তকে ভয় পেলেন? যারা প্রকৃত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের সুরক্ষা ও দায়মুক্তি দিয়েছে। এই দায়মুক্তিই সত্য উন্মোচন করে। যদি তারা কোনো অপরাধ না-ই করে থাকে, তবে তাদের সুরক্ষার প্রয়োজন হলো কেন? তাদের রক্ষা করাই প্রমাণ করে প্রকৃত খুনি কারা। তারেক রহমান তাঁর পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করে ভুক্তভোগীদের বিচার থেকে বঞ্চিত করছেন।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে রাজ্যে কোনো আইনশৃঙ্খলা নেই। একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতিকে মিথ্যা মামলায় জড়িত করে হাতে হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিচারকদের ওপর রামদা, চায়নিজ কুড়াল, লাঠিসোঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

যে দেশে আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মীদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে, গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়েছে—সেখানে এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। নারী ও মেয়েরাও ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ২০২১ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছিল। মানুষের জীবনের মান উন্নত হয়েছিল। দারিদ্র্যের হার কমে ১৮.৭%-এ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬%-এ নেমে এসেছিল। মানুষ শান্তিময়, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবনযাপন করছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়, গত দুই বছরের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে এই দেশকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে এবং সমস্ত অর্জন নস্যাৎ করা হয়েছে। দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে; এখন মানুষের জীবন বিপন্ন, ঘরে বা রাস্তায় কোনো নিরাপত্তা নেই। অথচ যারা ক্ষমতায় আছে তারা ক্ষমতা ভোগ করছে, অর্থ উপার্জন করছে এবং জনগণের কোনো পরোয়া করছে না। এমনকি টিকা না পাওয়ার কারণে শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বার্তাটি পরিষ্কার: উগ্রবাদ, সহিংসতা বা এর ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তির ধ্বংসের মাধ্যমে বাংলাদেশের কোনো নতুন পরিচয়ের প্রয়োজন নেই। গণতন্ত্র, সাংবিধানিক আদেশ, ধর্মীয় সম্প্রীতি, উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার মাধ্যমেই বাংলাদেশকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্বের জন্য মঙ্গলজনক। একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।

লেখক: শেখ হাসিনা, রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের পাঁচবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যা।

বাংলা করেছেন - অশ্রু হাসি,রাজনীতিবিদ,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।