মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

উপসম্পাদকীয়

‘প্রতিবেশীরা শুধু ভারতের স্বার্থেই কাজ করবে, এমন আশা রাখি না’! পাকিস্তান, বাংলাদেশ, চিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বড় বার্তা জয়শঙ্করের

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla) প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৪ এএম
 ‘প্রতিবেশীরা শুধু ভারতের স্বার্থেই কাজ করবে, এমন আশা রাখি না’! পাকিস্তান, বাংলাদেশ, চিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বড় বার্তা জয়শঙ্করের

নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক বৈদেশিক নীতিতে নীতিগত আধিপত্যের চেয়ে 'বাস্তবসম্মত লেনদেনমূলক কূটনীতি' বা প্রাগম্যাটিজমের প্রাধান্য বাড়ছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে একপাক্ষিক আনুগত্য প্রত্যাশার দিন শেষ। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে ভারত এখন সার্বভৌম স্বার্থ, সীমানা নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক সুবিধা বিনিময়ের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে।

কূটনৈক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের 'প্রতিবেশী প্রথম' নীতিতে এক প্রাগম্যাটিক বা বাস্তববাদী কৌশলগত রূপান্তর পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইকোনমিক টাইমস ওয়ার্ল্ড লিডার্স ফোরামে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বক্তব্য এই প্রজ্ঞাপূর্ণ রূপান্তরেরই স্পষ্ট প্রতিফলন। নয়াদিল্লি এখন প্রকাশ্যে মেনে নিচ্ছে যে প্রতিবেশী দেশগুলোর নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রয়েছে এবং তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কেবল ভারতের অনুকূলে আসবে—এমন আশা করা অসংগত। আধুনিক আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কার্যকর ও স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে উভয় পক্ষের লাভ নিশ্চিত করে এমন ‘সাধারণ ভিত্তি’ তৈরি করাই এখন ভারতের প্রাথমিক লক্ষ্য।

বাংলাদেশ কেন্দ্রিক কূটনীতি: পারস্পরিক স্বার্থের সমীকরণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ঢাকার সাথে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করছে নয়াদিল্লি। বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি এবং তার প্রেক্ষিতে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈক অঙ্গনে নানা আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। জয়শঙ্কর দ্বিপাক্ষিক সংবেদনশীল বিষয়গুলোর বিশদ প্রকাশ না করলেও পরিষ্কার জানিয়েছেন, ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে টিকে থাকতে হলে ‘উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষার পরীক্ষায়’ উত্তীর্ণ হতে হবে।

নয়াদিল্লির এই কৌশলগত বার্তা নির্দেশ করে যে, নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে ভারত এখন উভয় দেশের দীর্ঘমেয়াদী পারস্পরিক সুবিধা ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে ঢাকার সাথে কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

পাকিস্তান নীতি: সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তা বাধ্যবাধকতা

পাকিস্তান প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান আগের মতোই কঠোর ও অনমনীয়। জয়শঙ্করের ভাষ্যমতে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত ও ধারাবাহিকভাবে সন্ত্রাসবাদ প্রয়োগের যে চর্চা পাকিস্তান করে চলেছে, তা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই বিরল। নয়াদিল্লির অভ্যন্তরীণ জনমত এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই বিষয়ে নমনীয় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

পাশাপাশি, পাকিস্তান-মার্কিন ঐতিহ্যগত সম্পর্ক কিংবা পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যবর্তী ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র মতো নতুন বহুপাক্ষিক জোড়গুলোকে ভারত তার নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশের বাইরে রাখছে না। যেকোনো প্রতিবেশী বা তৃতীয় পক্ষ ভারতের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন হলে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ভারতের সামরিক ও প্রতিরক্ষা মূল্যায়নের অংশ হবে।

চীন সমীকরণ: সীমান্তে স্থায়িত্ব ও প্রতিযোগিতামূলক শক্তি

চীনের সাথে বিস্তৃত বাণিজ্যিক যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারতের নীতি পুরোপুরি সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত লাদাখ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের উত্তেজনা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছিল। জয়শঙ্কর স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই বেইজিংয়ের সাথে সুসম্পর্কের প্রধান পূর্বশর্ত। চীনের সাথে যেকোনো সংলাপে ভারত আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের অবস্থানে দৃঢ় থেকে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

সংক্ষেপে, এস জয়শঙ্করের এই বার্তা ভারতের পরিপক্ব ও বাস্তবমুখী কূটনৈতিক অবস্থানের চিত্র তুলে ধরে। নয়াদিল্লি আধিপত্যমূলক প্রত্যাশা পরিত্যাগ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশী কূটনীতির এক নতুন অধ্যায় সূচনা করতে চাচ্ছে, যেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই মূল দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)