রাজনীতিতে ভারত-বিদ্বেষ, ব্যাকস্টেজে সহযোগিতা: বাংলাদেশ-ভারত কূটনীতিতে দ্বিমুখী আচরণ ও এর সম্ভাব্য ঝুঁকি
ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম এনডিটিভি-তে সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রির সাম্প্রতিক নিবন্ধ বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক চেনা কিন্তু জটিল চিত্র উন্মোচন করেছে। একদিকে যখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কড়া ভারত-বিরোধী বক্তব্য এবং প্রতিবেশীকে নিশানা করে জনপ্রিয়তা কুড়ানোর চেষ্টা দৃশ্যমান, ঠিক তখনই অন্যদিকে নীরবে ভারত থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সুবিধা পেতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখা হয়েছে। রাজপথের চটকদার বক্তব্যের সাথে টেবিলের তলদেশের এই কূটনৈতিক বাস্তবতার বৈপরীত্য ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ওপর কিছু সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বস্ততা ও আস্থা সঙ্কট কূটনীতির মূল ভিত্তি হলো আস্থা। যখন কোনো দেশের নেতৃত্ব প্রকাশ্যে জনসমক্ষে এক ধরণের মনোভাব প্রকাশ করে এবং গোপনে সম্পূর্ণ বিপরীত সুবিধা দাবি করে, তখন মিত্র দেশের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বিশ্বস্ততার সঙ্কট তৈরি হয়। ভারত সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দ্বিমুখী অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদে 'অআন্তরিক আচরণ' হিসেবে গণ্য করতে পারে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো সংকটকালীন সহযোগিতাকে শ্লথ বা বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
অর্থনৈতিক ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে জটিলতা বর্তমানে বাংলাদেশ ভারত থেকে রামপালসহ একাধিক কেন্দ্র ও আদানি গ্রুপের ঝাড়খণ্ড বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করে নিজেদের জাতীয় গ্রিড সচল রাখছে। একই সাথে তারা নবায়নযোগ্য শক্তি ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যে ভারতের বিনিয়োগ এবং সহযোগিতা চাইছে। কিন্তু ক্রমাগত জনসমক্ষে ভারত-বিদ্বেষী প্রচার সচল রাখলে দিল্লির নীতি নির্ধারক এবং ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। নতুন বিদ্যুৎ চুক্তি স্বাক্ষর, স্বল্পমূল্যে সীমান্ত বাণিজ্য কিংবা বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে আটকে যেতে পারে।
কূটনৈতিক স্তরে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দ্বিপাক্ষিক সফর বাতিল বা আটকে যাওয়া শুধু আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি কূটনৈতিক টানাপোড়েনের একটি স্পষ্ট সংকেত। সরকার পরিবর্তন বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে পাকিস্তানের মতো ভারত-বিরোধী কোনো বলয়ের প্রতি ঝুঁকতে দেখলে দিল্লি তার আঞ্চলিক নিরাপত্তানীতি পুনর্বিন্যাস করতে পারে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের যে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে, তা কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় রূপ নিতে পারে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটে পিছিয়ে পড়া দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি (যেমন বিবিআইএন, বিমসটেক) অনেকাংশেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। রাজনীতি ও সম্পর্কের এই অস্থিরতার কারণে ভারত বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ (যেমন শ্রীলঙ্কা, নেপাল বা ভুটান) কেন্দ্রিক কানেক্টিভিটি প্রজেক্টে বেশি অগ্রাধিকার দিতে পারে। ফলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট ও ট্রানজিট সুবিধা হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া ভুল বার্তা স্থানীয় জনপ্রিয়তার জন্য এবং রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ভারত-বিদ্বেষকে উসকে দেওয়া হলে জনমানসে এমন এক মানসিকতা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে সাধারণ কোনো দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা গ্রহণ করতেও বাধা সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষ যখন জানে না যে বাস্তবতার খাতিরে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ভারতের ওপরেই অনেকাংশে নির্ভরশীল, তখন বিভ্রান্তিকর ভারত-বিরোধিতা ভবিষ্যতে কোনো সরকারের জন্যই টেকসই পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা কঠিন করে তোলে।
রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনে প্রতিবেশীকে ঢাল বানানো একটি সাময়িক কৌশল হতে পারে, কিন্তু বীণা সিক্রির ইঙ্গিত অনুযায়ী—এই ধরণের কৌশল একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্তই কাজ করে। বাস্তবমুখী কূটনীতি ও জাতীয় স্বার্থের তোয়াক্কা না করে দ্বিমুখী নীতি বজায় রাখলে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিই সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে পড়বে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
রাজনীতিতে ভারত-বিদ্বেষ, ব্যাকস্টেজে সহযোগিতা: বাংলাদেশ-ভারত কূটনীতিতে দ্বিমুখী আচরণ ও এর সম্ভাব্য ঝুঁকি
কার স্বার্থে মুক্ত জঙ্গিরা: রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা ও জাতীয় নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ
‘প্রতিবেশীরা শুধু ভারতের স্বার্থেই কাজ করবে, এমন আশা রাখি না’! পাকিস্তান, বাংলাদেশ, চিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বড় বার্তা জয়শঙ্করের