দ্বিধা ও চাপে ঢাকা: শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক সরবতায় ত্রিমুখী কূটনৈতিক সংকটে সরকার ।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর ক্রমবর্ধমান সরব উপস্থিতি বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য বড় ধরনের ত্রিমুখী সংকট তৈরি করেছে। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর একটি বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে শেখ হাসিনার ধারাবাহিক ভার্চয়েল অংশগ্রহণ এই জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
১. আইনি ও কূটনৈতিক মারপ্যাঁচ: শেখ হাসিনা কি সত্যিই 'পলাতক'?
ভারতের হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক মন্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের সময় শেখ হাসিনাকে কোনো সামরিক বাহিনী ভারতে ধরে নিয়ে যায়নি; বরং তৎকালীন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি সামরিক পরিবহন বিমানেই তিনি ভারতে যান। তখনো তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই বার্তার মাধ্যমে ভারত পরিষ্কার করতে চাইছে যে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান কোনো সাধারণ অপরাধীর পলায়ন নয়, বরং একটি জরুরি ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। ফলে তাঁকে সহজে বা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পলাতক আসামি হিসেবে প্রত্যর্পণ করার দাবি আইনি ও কূটনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
২. আন্তর্জাতিক মঞ্চে অপ্রতিরোধ্য উপস্থিতি ও নীরবতা
দিল্লির পর একে একে লন্ডন, নিউইয়র্ক এবং সবশেষ জেনেভায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন শেখ হাসিনা। বিশ্বখ্যাত মানবাধিকারকর্মী ও বিদেশি সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিতে এসব সভায় তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। এর আগে ভারতের ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন নিয়ে ঢাকা কড়া প্রতিবাদ জানালেও, যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডের সাম্প্রতিক অনুষ্ঠানগুলোর পর বর্তমান সরকার কার্যত নীরব রয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার ভয়ে সরকার এখন এই উপস্থিতি মেনে নিতে এক প্রকার বাধ্য হচ্ছে।
৩. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভারতের বার্তা
কড়া নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল জুম বৈঠক সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এর পাশাপাশি, কলকাতায় বাংলাদেশ মিশন ঘেরাওয়ের মতো ঘটনা এবং ভারতের নতুন কড়া বার্তা ঢাকাকে আরও বেশি কূটনৈতিক চাপে ফেলেছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, আইনি প্রত্যর্পণের জটিল পথে না হেঁটে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টির সুরাহা করাই বাস্তবসম্মত।
সব মিলিয়ে, অক্টোবর জুড়ে শেখ হাসিনার নির্ধারিত আরও কিছু আন্তর্জাতিক কর্মসূচি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বর্তমান সরকারকে এক কঠিন ও বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
সেনাপ্রধানের পদ নিয়ে টানাপোড়েন ও ক্ষমতার রাজনীতি: অন্তরালের সমীকরণ
ধানক্ষেতে শেষ আকুতি ‘বাবা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে...’—কাগজে-কলমে নিরাপদ রাষ্ট্রে একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়ার গল্প ।
শেখ হাসিনার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও রিকনসিলিয়েশন: নেপথ্য কূটনীতিতে বদলাচ্ছে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট: পর্দার অন্তরালের সমঝোতা?