ভেঙে পড়ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা, সংকটে সরকার! ক্লিন হার্ট থেকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা: অভ্যন্তরীণ সংকটে সেনাবাহিনী কতটা স্বস্তিতে? রক্তপাতহীন গণতন্ত্র নাকি মব সন্ত্রাস?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ও সরকারের অস্বস্তি
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নজিরবিহীন ও চরম সংকটজনক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খুন, চাঁদাবাজি, জবরদখল এবং মব সন্ত্রাসের অভূতপূর্ব বৃদ্ধিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। ১৭ বছর পর ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দলটির গত সাত মাসের কার্যকালে এমন নৈরাজ্য সরকারকেও ফেলছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যে, এই অস্থিতিশীলতা কঠোর হাতে দমন করা না হলে অচিরেই আরও বড় ধরনের জাতীয় সংকটের মুখোমুখি হতে হবে সরকারকে।
পুলিশের ওপর আস্থাহীনতা এবং মাঠপর্যায়ের অসহায়ত্ব
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনকে মাঠে নামানো হলেও বারবার তারা মব সন্ত্রাস ও হামলার শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদকালে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের ওপর হামলা, দুটি গাড়িতে আগুন এবং পুলিশ সদস্যদের আহত হওয়ার ঘটনা তারই প্রমাণ। বিশেষ করে, পুলিশ কর্মকর্তাদের বিতর্কিত অডিও ফাঁস এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাহিনীটির ওপর সরকারের শীর্ষ মহলের আস্থা মারাত্মকভাবে নড়ে গেছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের তথ্য হালনাগাদ করার নির্দেশ আসলেও সার্বিক শূন্যতা ঢাকতে তা পর্যাপ্ত মনে হচ্ছে না।
যৌথ অভিযান ও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার দ্বিমুখী ভাবনা
পুলিশ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় সরকার এখন কঠোর বিকল্পের কথা ভাবছে। একটি পক্ষ ২০০২ সালের আদলে 'অপারেশন ক্লিন হার্ট'-এর মতো সাঁড়াশি অভিযান চালাতে চাইছে। অন্য পক্ষটি বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতো সশস্ত্র বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানোর পক্ষে। মূলত তিন মাসের জন্য সেনাবাহিনীকে মাঠে রেখে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে চায় নীতি নির্ধারকরা। সেনাবাহিনীর আপত্তির নেপথ্য ও সেনাসদরের জরুরি দরবার
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং মানবাধিকার লংঘনের আশঙ্কায় সেনাবাহিনী সরাসরি সিভিল প্রশাসনের সঙ্গে এ ধরনের অভিযানে জড়াতে নারাজ। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বারবার স্পষ্ট করেছেন যে, সেনাবাহিনীর মূল দায়িত্ব সীমান্ত রক্ষা ও যুদ্ধক্ষেত্র সামলানো। তা সত্ত্বেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে সেনাসদরে ১ অক্টোবর একটি জরুরি দরবার ডাকা হয়, যার কারণে সেনাপ্রধানের পূর্বনির্ধারিত পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরও বাতিল করা হয়। সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানদের বৈঠকে বর্তমান সংকটের বিভিন্ন দিক নিয়ে তীব্র আলোচনা হয়েছে।
একটি স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে বারবার অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব কেন সশস্ত্র বাহিনীকে অর্পণ করতে হবে—এই প্রশ্ন এখন জোড়ালো হয়ে উঠেছে। মব সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে বারবার সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরতা রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
সেনাপ্রধানের পদ নিয়ে টানাপোড়েন ও ক্ষমতার রাজনীতি: অন্তরালের সমীকরণ
ধানক্ষেতে শেষ আকুতি ‘বাবা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে...’—কাগজে-কলমে নিরাপদ রাষ্ট্রে একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়ার গল্প ।
শেখ হাসিনার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও রিকনসিলিয়েশন: নেপথ্য কূটনীতিতে বদলাচ্ছে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট: পর্দার অন্তরালের সমঝোতা?