ভারতীয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে চাপ: কেন তারেকের ভারত সফর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ: দিল্লি সফরের পথ খুজছে ঢাকা ?
বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক এক স্পর্শকাতর সময় পার করছে। এমন এক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর কেবল দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক কুশল বিনিময়ের সুযোগ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, খাদ্য আমদানি ও সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল সংকটের কারণে টালমাটাল, তখন ভারতের সঙ্গে সরাসরি ও সুসংহত যোগাযোগ রক্ষা করা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বাস্তবতা
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভারতের ভূমিকা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসা বিদ্যুৎসহ ভারতীয় সরবরাহ সরাসরি জাতীয় গ্রিডকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে। যদিও নিজস্ব কয়লা, গ্যাস ও তরল জ্বালানি ব্যবহার করে ভারত-নিরপেক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প উৎপাদনে গেলে বিশাল অংকের অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের চাপ তৈরি হবে।
বিশেষ করে ডিজেল আমদানির ক্ষেত্রে 'ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন' একটি কৌশলগত অবকাঠামো। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতে বিকল্প দূরবর্তী বাজার থেকে বেশি খরচে জ্বালানি আনার চেয়ে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা বাংলাদেশের সার্বিক পরিবহন ও কৃষি খাতের জন্য সাশ্রয়ী।
৩০-৬০-৯০ দিনের চাপ ও ঝুঁকির চিত্র
কূটনৈতিক টানাপোড়েনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার ধাপে ধাপে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে:
• প্রথম ৩০ দিন: তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি হবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, লোডশেডিং বৃদ্ধি এবং পরিবহন ও সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে। তবে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার কারণে খাদ্য সংকটের ভয় প্রাথমিক পর্যায়ে থাকবে না।
• ৬০ দিন: বিকল্প উৎস থেকে দামি তরল জ্বালানি এনে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানের ফলে ডলার সংকট তীব্র রূপ নেবে। বাণিজ্য ঘাটাই তৈরি করবে একটি নতুন অর্থনৈতিক চক্র—ডলারের টানাটানি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন হ্রাসের মাধ্যমে রপ্তানি আয়ে ধস। তৈরি পোশাক, সিমেন্ট ও টেক্সটাইলের মতো বিদ্যুৎ-সংবেদনশীল খাতগুলো এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
• ৯০ দিন: দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ বিঘ্নিত হলে সংকট কেবল জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চল বা আন্তর্জাতিক গম বাজারে সংকট থাকলে ভারতের ওপর খাদ্য আমদানির নির্ভরতা আরও স্পষ্ট হয়।
অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব
এই সম্ভাব্য ভারত সফরকে তাই কেবল একটি রাজনীতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের জন্য একাধিক কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম:
• জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা: ভারতীয় বিদ্যুৎ ও ডিজেল চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা এবং সঠিক মূল্য নির্ধারণ কাঠামো সুনির্দিষ্ট করা।
• খাদ্য সরবরাহ সুসংহতকরণ: চাল, গম ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে একটি জরুরি 'স্ট্রেজিক বাফার' বা সরবরাহ নিশ্চিত রাখা।
• বাণিজ্যিক ভারসাম্য: সীমান্ত বাণিজ্য ও স্থলবন্দরের অদৃশ্য প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখা।
কৌশল: সহযোগিতা বৃদ্ধি, কিন্তু নির্ভরতা কমানো
ভারত সফরের মূল উদ্দেশ্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলানো হলেও, তা কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা বাড়ানোর জন্য নয়। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের উচিত শক্তির উৎস বহুমুখী করা, নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৌশলগত রিজার্ভ বাড়ানো এবং আসিয়ান (ASEAN), চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সুষম 'এনার্জি ডিপ্লোমেসি' বজায় রাখা।
ভারত বাংলাদেশের একমাত্র জীবনরেখা নয়, আবার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতকে বাদ দিয়ে চলাও অর্থনৈতিকভাবে বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তারেক রহমানের এই সম্ভাব্য সফরকে দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্থিতিশীল, প্রাতিষ্ঠানিক ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক কাঠামো তৈরির উচ্চপর্যায়ের দরকষাকষির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
লেখক: আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ, মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।
সম্পর্কিত সংবাদ
কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তাশঙ্কা ও সরকারের উদাসীনতা: কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের ব্যাপক মতবিরোধ ও হট্টগোল,আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কি সংকটে?
গ্যাসসরবরাহে নেই উন্নতি, বন্ধ হয়ে গেছে ৯০০-র বেশি টেক্সটাইল মিল, চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই – বলছেন মন্ত্রী
সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের ত্রিপক্ষীয় কাঠামোয় যোগদানে সরকারের মনোভাব ইতিবাচক -হুমায়ুন কবির: ও ঝুঁকি