কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তাশঙ্কা ও সরকারের উদাসীনতা: কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের ব্যাপক মতবিরোধ ও হট্টগোল,আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কি সংকটে?
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে উগ্রবাদী তৎপরতা ও সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে আল-কায়দার গোপন সেল ও স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির চেষ্টার তথ্য প্রকাশের পর এই উদ্বেগ নতুন মাত্রা পায়। তবে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পরিবর্তে সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে প্রতিনিয়ত হালকাভাবে দেখা এবং একপ্রকার অস্বীকার করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
কূটনৈতিক অঞ্চলে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক টানাপোড়েন
সম্প্রতি ঢাকার বারিধারায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসে ইমেইলের মাধ্যমে উগ্রবাদী সংগঠনের পরিচয়ে হামলার হুমকি দেওয়া হয়। এই হুমকির পর রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং চীনা কর্মকর্তারা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। তবে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক উদাসীনতার কারণে পুলিশ অবিলম্বে বাড়তি নিরাপত্তা মোতায়েনে রাজি হয়নি।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বারিধারার চীনা দূতাবাসে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য আয়োজিত এক বৈঠকে ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের ব্যাপক মতবিরোধ ও হট্টগোল ঘটে। শুধু চীন নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে বড় বিনিয়োগকারী দেশ জাপানের দূতাবাসেও একই ধরণের আলোচনা হলেও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের অভাব দূতাবাস পাড়ায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে। পরবর্তীতে কয়েকদিনের টানা কূটনৈতিক চাপের মুখে অবশেষে গুলশান ও বারিধারা কূটনৈতিক এলাকায় পোশাকধারী এবং সাদা পোশাকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও সরকারের অবস্থান
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রকাশিত উদ্বেগজনক প্রতিবেদনটিকে সরকারের তরফে "অনুমান নির্ভর" বলে অভিহিত করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এই হুমকির ঘটনাকে কোনো ভিত্তিপ্রস্তর বা বাস্তব ঝুঁকি হিসেবে না দেখে, কেবল "ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে ভুয়া গ্রুপের অপপ্রয়াস" হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—সুনির্দিষ্টভাবে মূল অপরাধীদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার না করেই কীভাবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এটিকে ভুয়া বলে নিশ্চিত করছে?
বিষয় / ঘটনা সরকারের বক্তব্য ও পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া জাতিসংঘের প্রতিবেদন তথ্যটি "অনুমান নির্ভর" ও অপপ্রচার। আল-কায়দার ঘাঁটি ও গোপন সেল তৈরির তথ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ। চীনা দূতাবাসে হুমকি চাঁদা দাবির উদ্দেশ্যে করা ভুয়া গ্রুপের কাজ। নিরাপত্তা বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ ও দ্রুত বর্ধিত নিরাপত্তার দাবি। কূটনৈতিক নিরাপত্তা দেরিতে হলেও গুলশান-বারিধারায় বাড়তি মোতায়েন। নিরাপত্তা নিশ্চয়তা না পাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিয়ে সংশয়।
ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র ইতোপূর্বেই মার্কিন দূতাবাসে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও রেকি করার নথিপত্র প্রদান করেছিল, যার ওপর ভিত্তি করে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়েছিল। চীনের মতো মিত্র রাষ্ট্রের সঙ্গে এই ধরণের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিবাদ বাংলাদেশ সরকারের কূটনীতিকে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
তিস্তা প্রকল্পসহ বিভিন্ন বৃহৎ জাতীয় অবকাঠামো ও বাণিজ্য খাতে চীনের বিনিয়োগের বিষয়টি এখন স্থবিরতার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কোনো দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও উগ্রবাদের বিকাশ ঘটলে বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাহত হওয়া স্বাভাবিক।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
ভারতীয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে চাপ: কেন তারেকের ভারত সফর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ: দিল্লি সফরের পথ খুজছে ঢাকা ?
গ্যাসসরবরাহে নেই উন্নতি, বন্ধ হয়ে গেছে ৯০০-র বেশি টেক্সটাইল মিল, চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই – বলছেন মন্ত্রী
সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের ত্রিপক্ষীয় কাঠামোয় যোগদানে সরকারের মনোভাব ইতিবাচক -হুমায়ুন কবির: ও ঝুঁকি