মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

গ্যাসসরবরাহে নেই উন্নতি, বন্ধ হয়ে গেছে ৯০০-র বেশি টেক্সটাইল মিল, চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই – বলছেন মন্ত্রী

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৬ এএম
গ্যাসসরবরাহে নেই উন্নতি, বন্ধ হয়ে গেছে ৯০০-র বেশি টেক্সটাইল মিল, চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই – বলছেন মন্ত্রী

বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী ও শিল্প খাতে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা দেওয়া জ্বালানি সংকট এক অভূতপূর্ব বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপের কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। ফলে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক (আরএমজি), ইস্পাত, কাগজ এবং সিরামিকের মতো উচ্চমাত্রার জ্বালানি-নির্ভর খাতগুলোতে উৎপাদন সক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে।

উৎপাদন ব্যবস্থার ধস এবং টেক্সটাইল খাতের পক্ষাঘাত

শিল্প খাতের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল উৎপাদন হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পূর্ণাঙ্গ স্থবিরতায় রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, তাদের নিবন্ধিত ১,৮০০টিরও বেশি সদস্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি—অর্থাৎ ৯০০টিরও বেশি মিল গ্যাসের চরম অপ্রাপ্তির কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প প্রক্রিয়া চালু রাখার জন্য নূন্যতম ১৫ পিএসআই (PSI) গ্যাসের চাপের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জের মতো প্রধান শিল্প ক্লাস্টারগুলোতে এই ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর সরাসরি প্রভাবে স্পিনিং, ডাইং ও ক্যালেন্ডারিং কারখানাগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে, যা পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে (Supply Chain) অচল করে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি ও মানবসম্পদ সংকট

চলমান এই অচলাবস্থার ফলে শিল্প উদ্যোক্তারা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। একক একটি স্পিনিং মিলেই প্রতিদিন আনুমানিক দুই কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি নিবন্ধিত হচ্ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকার পাশাপাশি নিয়মিত পরিচালন ব্যয়, ঋণের সুদ, এবং গ্যাস-বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধের চাপ কারখানা মালিকদের দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম করেছে।

এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে করুণ বলি হচ্ছেন সাধারণ শ্রমিকেরা। উৎপাদন-ভিত্তিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকেরা কারখানার চাকা বন্ধ থাকায় চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। নরসিংদীর মাধবদীর মতো ঐতিহ্যবাহী তাঁতাঞ্চলে কাজের সুযোগ ও মজুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ রাজপথে গড়িয়েছে। যদিও স্থানীয় প্রশাসন আন্দোলনের খবর অস্বীকার করার কৌশল নিয়েছে, কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, জীবিকা হারানো শ্রমিকদের ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা এখন সামাজিক অস্থিরতার রূপ নিচ্ছে।

নীতিগত অনিশ্চয়তা ও অবকাঠামোগত ভঙ্গুরতা

গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (FSRU) কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে যে প্রাথমিক সংকট শুরু হয়েছিল, তা আজ গভীর প্রশাসনিক অদক্ষতায় পরিণত হয়েছে। নীতি-নির্ধারকদের বারবার আশ্বাস এবং সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ সত্ত্বেও সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। সরকারের এই "চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার নেই" অবস্থান বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

স্বল্পমেয়াদী আমদানি-নির্ভরতা এবং একক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত অবিশ্বস্ততার কারণেই আজ দেশের মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি অবরুদ্ধ। অনতিবিলম্বে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামোগত ত্রুটি দূর করা না গেলে, এই জ্বালানি সংকট দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক দীর্ঘমেয়াদী মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)

সম্পর্কিত সংবাদ

ভারতীয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে চাপ: কেন তারেকের ভারত সফর বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ: দিল্লি সফরের পথ খুজছে ঢাকা ?

কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তাশঙ্কা ও সরকারের উদাসীনতা: কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের ব্যাপক মতবিরোধ ও হট্টগোল,আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কি সংকটে?

সৌদি, পাকিস্তান ও তুরস্কের ত্রিপক্ষীয় কাঠামোয় যোগদানে সরকারের মনোভাব ইতিবাচক -হুমায়ুন কবির: ও ঝুঁকি