দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক তলানিতে: তারেক সরকারের চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও ভারতের কৌশলগত দূরত্ব
দিল্লির কূটনৈতিক পাড়ায় এখন একটাই নির্মম সত্য—বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্কে গভীর বরফ জমে গেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এবং দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের শীতল আচার-আচরণে সেই অনাস্থার ইঙ্গিত আজ স্ফটিকস্বচ্ছ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে একসময় নয়াদিল্লির অন্দরে যে বাড়তি উৎসাহ ও উষ্ণ তৎপরতা দেখা গিয়েছিল, তা আজ সম্পূর্ণ ফুরিয়ে তলানিতে ঠেকেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল কোনো সাধারণ দ্বিপক্ষীয় সফর বিলম্বিত হওয়ার মামুলি ঘটনা নয়, বরং দুই দেশের আস্থার সংকটের এক নগ্ন ও গভীরতম প্রকাশ।
দিল্লির চরম মোহভঙ্গ ও আস্থার চূড়ান্ত সংকট
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নির্বাচনী বিজয়ের পরপরই কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভেঙে সবার আগে টেলিফোনে অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমানকে যে আন্তরিক বার্তা দিয়েছিলেন, আজ সেই আগ্রহে দেখা দিয়েছে প্রবল ভাটার টান। এর পেছনে রয়েছে একাধিক স্পর্শকাতর ও দীর্ঘমেয়াদি কারণ:
• সন্ত্রাসবাদ দমনে চরম নিষ্ক্রিয়তা: • সীমান্তজুড়ে জঙ্গি আস্তানা নির্মূল এবং মৌলবাদী শক্তি দমনে ঢাকা কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলে দিল্লির জোরালো অভিযোগ রয়েছে।
• অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির অভাব:
• রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির কোনো সদিচ্ছা বর্তমান সরকারের মধ্যে দেখা যায়নি। • রাজনৈতিক স্থায়িত্বের অভাব:
• নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারক মহলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, তারেক রহমান সরকারের রাজনৈতিক মেয়াদ ও স্থায়িত্ব নিয়ে খোদ দেশের ভেতরেই এখন ঘোর সংশয় তৈরি হয়েছে।
সফরের মারপ্যাঁচ, কূটনৈতিক ছেলেখেলা ও নয়াদিল্লির উদাসীনতা
গত কয়েক মাস ধরে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকার নীতিনির্ধারকদের নানা কূটকৌশল ও দরকষাকষির শেষ ছিল না। রাষ্ট্রপতির ভবন থেকে শুরু করে সাউথ ব্লক পর্যন্ত যখন সব আনুষ্ঠানিকতার প্রস্তুতি চূড়ান্ত, ঠিক তখনই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামনে এনে সফর ঝুলিয়ে দেয় ঢাকা। এমনকি ব্রিকস বা বিমস্টিক সম্মেলনের সাইডলাইনে যোগদানের আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার ও সুযোগকে রাজনীতির বলি বানিয়ে বাংলাদেশ চরম কূটনৈতিক অপরিণামদর্শিতা দেখিয়েছে।
এর ফলস্বরূপ, ভারতের পক্ষ থেকে এখন প্রদর্শিত হচ্ছে চরম ও অবজ্ঞাসূচক উদাসীনতা। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক সাফ মন্তব্য—"সফর নিয়ে তাড়াহুড়োর কিছু নেই, যথাসময়ে তা হবে"—মূলত দিল্লির এই বরফশীতল মনোভাবেরই অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কঠোর বার্তা।
অভ্যন্তরীণ শাসন দুর্বলতা ও মার্কিন ভিসার গেরো
শুধু ভারতের সঙ্গেই নয়, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্কের পারদ ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী। বিশ্বমঞ্চে কোণঠাসা হয়ে পড়া সরকারের শীর্ষপর্যায়ের মার্কিন ভিসার আবেদন আটকে থাকার গুঞ্জন এখন চাউর হয়েছে। যার জেরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও কাক্সিক্ষত ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলো থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ন্যূনতম প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা এবং অভ্যন্তরীণ শাসনতান্ত্রিক চরম দুর্বলতাই আজ তারেক রহমান সরকারকে বন্ধুহীন ও কোণঠাসা করে দিচ্ছে। নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকরা এখন হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছেন, এই ভঙ্গুর সরকারের পেছনে অতিরিক্ত সময় বা কূটনৈতিক বিনিয়োগ ব্যয় করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। দিল্লির পরিবর্তিত সমীকরণ: অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে ছিটকে পড়ছে ঢাকা
ভারতের কৌশলগত নীতিনির্ধারকরা এখন নিশ্চিত যে, বর্তমান কাঠামোর অধীনে ঢাকা থেকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা অসম্ভব। গোয়েন্দা সূত্র ও নীতিনির্ধারকদের আনাগোনা এবং পরবর্তী ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, ভারত সরকার তারেক রহমান প্রশাসনের ওপর থেকে নিজেদের আস্থার সম্পূর্ণ চাবিকাঠি গুটিয়ে নিয়েছে। অতিরিক্ত তোষামোদ বা একতরফা তাগাদা দিয়ে আর যাই হোক, নয়াদিল্লির মন জয় করা সম্ভব নয়। ফলস্বরূপ, ভারতের আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান মানচিত্রে ঢাকা এখন আর কোনোভাবেই তালিকার উঁচুতে নেই, বরং দিন দিন উপেক্ষিত এক অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
সেনাপ্রধানের পদ নিয়ে টানাপোড়েন ও ক্ষমতার রাজনীতি: অন্তরালের সমীকরণ
ধানক্ষেতে শেষ আকুতি ‘বাবা, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে...’—কাগজে-কলমে নিরাপদ রাষ্ট্রে একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়ার গল্প ।
শেখ হাসিনার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও রিকনসিলিয়েশন: নেপথ্য কূটনীতিতে বদলাচ্ছে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট: পর্দার অন্তরালের সমঝোতা?