বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

চব্বিশের মব সম্রাট মুহাম্মদ ইউনুস: ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্র ও পরিণতি

✍ লিখেছেন: ড.আওলাদ হোসেন, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৪:৫২ পিএম
চব্বিশের মব সম্রাট মুহাম্মদ ইউনুস: ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্র ও পরিণতি

১৯৯৫-৯৬ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদল—বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও জটিল অধ্যায়। এই পুরো সময়জুড়ে দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং গণতান্ত্রিক ধারাকে বাধাগ্রস্ত করতে দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্রের নানামুখী ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত ছিল। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান কুশীলব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস, যিনি শেষ পর্যন্ত নিজেই সেই মব সংস্কৃতির শিকার হয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন।

গ্যাস রপ্তানি থেকে শুরু হওয়া ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ রক্ষা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ১৯৯০-এর দশক থেকেই শুরু হয় বিদেশি চাপের রাজনীতি। ২০০০ সালের মার্চ মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ঐতিহাসিক ঢাকা সফরে গ্যাস রপ্তানির আগ্রহ প্রকাশ করা হলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অন্তত ৫০ বছরের নিজস্ব মজুদ নিশ্চিত করার পরই কেবল রপ্তানির কথা ভাবা হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই দৃঢ় অবস্থানই ছিল দেশি-বিদেশি শক্তির চক্রান্তের প্রধান টার্নিং পয়েন্ট। ফলস্বরূপ, ২০০১ সালের নির্বাচনে গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে এবং দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটে। এমনকি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলাও চালোনো হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল নেতৃত্বশূন্য করা।

ওয়ান-ইলেভেন ও ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা

২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের আড়ালে জরুরি অবস্থা জারি এবং সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায় প্রভাবশালী মহল। পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হিসেবে তখন ড. মুহাম্মদ ইউনুস সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন এবং ‘নাগরিক শক্তি’ নামে দল গঠনের ঘোষণা দেন। তবে জনরোষ ও জনগণের সমর্থন না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে কঠোর হাতে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র শুরু হয়, যার অংশ ছিল বিডিআর বিদ্রোহের মতো ঘটনাও।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের উত্থান এবং নতুন ষড়যন্ত্র

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। জি-৭ এবং জি-২০ সম্মেলনে বিশেষ আমন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক নেতাদের প্রশংসাবাণী এবং জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ফলে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। তবে ২০১১ সালে বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ায় গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ড. ইউনুসের বাধ্যতামূলক অবসর গ্রহণকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক চাপ আরও তীব্র হয়। গ্রামীণ কল্যাণের কর ফাঁকি সংক্রান্ত আইনি রায় এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধের নির্দেশকে কেন্দ্র করে ইউনুস পন্থী ও আন্তর্জাতিক লবি দেশ ও বিদেশে সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালাতে শুরু করে।

চব্বিশের অভ্যুত্থান: সিভিল-মিলিটারি ছক ও মব সন্ত্রাস

২০২৪ সালের পটপরিবর্তনকে নিছক ছাত্র আন্দোলন হিসেবে দেখা হলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও নথির তথ্য অনুযায়ী এর নেপথ্যে কাজ করেছে দীর্ঘমেয়াদী এক বেসামরিক-সামরিক ছক। রোহিঙ্গা সংকট, বিদেশি তহবিল, এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী চক্রের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। মুহাম্মদ ইউনুস ও তার সহযোগীরা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্মারকগুলো ধ্বংস করার পাশাপাশি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে।

শেষকথা ক্ষমতার পালাবদলে ২০২৫ সালের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দেশের সংকট কাটেনি। বরং মৌলবাদী অপশক্তি ও উগ্রপন্থার আস্ফালন দিন দিন উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। ড. মুহাম্মদ ইউনুস নিজের স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের পর ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও রেখে গেছেন এক অস্থিতিশীল ও ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ। ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—যে মব সংস্কৃতি ও বিশৃঙ্খলার ওপর ভর করে তিনি ক্ষমতার মসনদে বসেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই মব এবং পরিস্থিতির আবর্তেই তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে।

লেখক: ড.আওলাদ হোসেন, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: