বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

শ্রমিক নেবে না জাপান:অর্থনৈতিক নীতিহীনতা ও কূটনৈতিক বিভ্রান্তি: বাংলাদেশের সামগ্রিক কাঠামোগত সংকটের চিত্র

✍ লিখেছেন: ড.আওলাদ হোসেন, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ৫:২০ পিএম
শ্রমিক নেবে না জাপান:অর্থনৈতিক নীতিহীনতা ও কূটনৈতিক বিভ্রান্তি: বাংলাদেশের সামগ্রিক কাঠামোগত সংকটের চিত্র

সম্প্রতি জাপান সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সংবাদকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস সেকশন ও প্রেস সেক্রেটারি কিতামুরা তোশিহিরো সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে বার্ষিক ১ লাখ শ্রমিক গ্রহণের কোনো চুক্তি বা প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি জাপান সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।

২৭ অক্টোবরের দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকের কার্যবিবরণী উল্লেখ করে জানানো হয়, আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিস্তৃত করা, কোনো সুনির্দিষ্ট শ্রমিক কোটা নির্ধারণ নয়। বেসরকারি ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রস্তাবনা এবং দেশীয় গণমাধ্যমের অপরিপক্ক প্রচারণার কারণে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল, জাপানের স্পষ্টীকরণের মাধ্যমে তার অবসান ঘটেছে।

জাপানে বাংলাদেশি মানবসম্পদ পাঠানো: সূচনা ও নেপথ্যের গল্প

জাপান সাধারণত মানবসম্পদ আমদানি করে না । কিন্তু জাপানে শিশু জন্মের হার কমে যাওয়ায় জাপানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে থাকে। এমতাবস্থায় জাপান সরকার Japan International Trainee & Skilled Worker Cooperation Organization (JITCO), বাংলা নাম: জাপান আন্তর্জাতিক মানবসম্পদ সহযোগিতা সংস্থা এর মাধ্যমে পৃথিবীর অনুন্নত দেশগুলো থেকে প্রশিক্ষণের জন্য প্রতি বছর ২ লক্ষ করে কর্মক্ষম মানুষকে ভিসা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল । চুক্তি মোতাবেক এই মানুষেরা বিনা পয়সায় তিন বছরের ভিসা পাবে, আসা-যাওয়ার উড়োজাহাজ ভাড়া এবং থাকা-খাওয়া বাবদ নির্দিষ্ট হারে ভাতা পাবে। চুক্তি মোতাবেক ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরে যে যেই কাজে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, সে সেই বিষয়ে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে। যেই এজেন্সি সমূহের মাধ্যমে মানুষআসবে, সেই এজেন্সি ঐ ব্যক্তির নিকট থেকে কোন টাকা বা কোন সুবিধা নিতে পারবে না। জাপান সরকার পুরো তিনবছর ঐ এজেন্সিকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে অর্থ প্রদান করবে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তৎকালীন সময়ে জাপানে কর্তব্যরত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব আমার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে এই তথ্য আমাকে জানান। আমি দুইবার ব্যক্তিগত সফরে জাপান যাই। বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিবের মাধ্যমে JITCO এর সাথে বৈঠক করি। এই বিষয়ে তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও সচিব খোরশেদ আলম সাহেকে বিস্তারিত অবহিত করি এবং এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে উনাদের অনুরোধ করি। উনাদের সম্পৃক্ততা ও আগ্রহে JITCO প্রতিনিধি দল দুইবার বাংলাদেশ সফর করে। এই সকল কর্মকান্ডে আমি সক্রীয়ভাবে সহযোগিতা করি।

২৮–২৯ নভেম্বর ২০১০ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানের প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানের আমন্ত্রণে সরকারি সফরে জাপান যান। ঐ সফরে আমিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ছিলাম।

এই সফরে JITCO প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অফিসিয়াল মিটিংয়ে বাংলাদেশ থেকে কর্মক্ষম মানুষকে ট্রেনিং এর জন্য জাপানে আনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ঐ সরকারী মিটিংয়ে উদ্যোগক্তা হিসেবে আমিও উপস্থিত ছিলাম। পরবর্তীতে বাংলাদেশের ১৫ টি এজেন্সিকে এই কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার লাইসেন্স প্রদান করেন।

সেই থেকে বাংলাদেশ থেকে কর্মক্ষম মানুষ সরকারীভাবে জাপানে যাওয়া শুরু করে।

২. অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন ও ক্রমবর্ধমান ঋণভার: ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপের চিত্র

দেশের অভ্যন্তরে রাজস্ব আহরণের চরম ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক খাতের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪,২৪৫ কোটি টাকা। সামনে সরকারি বেতন স্কেল পরিশোধ ও চলমান ঘাটতি পূরণের জন্য বিশেষ ট্রেজারি বিল (১৪ দিন মেয়াদি) ইস্যু করে অতিরিক্ত ৫,০০০ কোটি টাকা ঋণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা নিয়ে অর্থসংক্রান্ত বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। মহাহিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) এবং সাবেক অর্থ সচিবদের মতে, নিয়মিত পরিচালন ব্যয় পরিশোধে স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলের ব্যবহার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নীতিগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

৩. রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতা ও অদূরদর্শী বিনিয়োগ: বেসরকারি খাতের সংকোচন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের বাজেট ঘাটতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিকে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, অন্যদিকে অগ্রাধিকারহীন ও অপরিকল্পিত প্রকল্পে ব্যয়ের ধারাবহিকতার কারণে অর্থব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।

সরকারি খাতের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বেসরকারি খাতে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট সৃষ্টির ফলে বেসরকারি বিনিয়োগের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর সরাসরি ফলাফলে দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতে স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৪. দীর্ঘমেয়াদি ঋণঝুঁকি ও প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্বের শঙ্কা

দেশের সার্বিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার বিপরীতে অপরিকল্পিত ঋণগ্রহণের এই ধারাবহিকতা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২৮-২৯ অর্থবছর নাগাদ সরকারের মোট ঋণের আকার আনুমানিক ৩৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। আয় বৃদ্ধি না করে কেবল ঋণের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনার এ ধারা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে চরম দেউলিয়াত্ব ও সার্বভৌম অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে অর্থনীতিবিদগণ সতর্ক করেছেন।

লেখক: ড.আওলাদ হোসেন, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এই সংবাদটি শেয়ার করুন: