কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন ও ভারতবিরোধী উসকানি: দিনেশ ত্রিবেদী ইস্যু এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার নেপথ্য ও অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতির স্বরূপ
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার ভারতীয় হাই কমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে প্রত্যাহারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর আন্দোলন ও আল্টিমেটাম নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এই আন্দোলনের নেপথ্য কারণ, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের বিভিন্ন দিক সামনে উঠে আসছে।
১. দিনেশ ত্রিবেদী প্রত্যাহার আন্দোলন: উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডা ও বাস্তবতা
ভারতীয় হাই কমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে প্রত্যাহারের দাবিতে সাম্প্রতিক সময়ে যে আল্টিমেটাম ও আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তার পেছনে সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। হাই কমিশনার হিসেবে যোগদানের পর থেকে তিনি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন এবং সম্প্রতি রেকর্ডসংখ্যক টুরিস্ট ভিসা চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ হয়েছে। অথচ উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এবং বাহ্যিক প্ররোচনায় এই ধরনের অযৌক্তিক ও আক্রমণাত্মক দাবি তুলছে।
২. রাষ্ট্রীয় ও গোয়েন্দা মহলের প্রচ্ছন্ন মদদ বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটেও ভারতবিরোধী ছোট গোষ্ঠীগুলোর এমন প্রকাশ্য কর্মসূচি পালনের সুযোগ পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার বা রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের একটি নির্দিষ্ট অংশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ ও নমনীয় নীতির কারণেই এই চক্রগুলো বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি যেখানে স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বা রাজপথে দাঁড়াতে বাধার মুখে পড়ছে, সেখানে এই উগ্র গোষ্ঠীগুলোর অবাধ কার্যক্রম সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করছে।
৩. আন্তর্জাতিক লবিং ও আঞ্চলিক ষড়যন্ত্রের অংশ
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা করার পেছনে বহিরাগত শক্তি ও বিভিন্ন আঞ্চলিক চক্রের মদদ কাজ করছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের চেতনা বিরোধী এবং পাকিস্তানের আদর্শ ধারণকারী কিছু গোষ্ঠী দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে এবং ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী নষ্ট করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই গোষ্ঠীগুলো কেবল কূটনীতিবিদদের ব্যক্তিগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে না, বরং দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সহযোগিতাকেও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
৪. কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
যেকোনো দেশের হাই কমিশনার বা রাষ্ট্রদূতের নিয়োগ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট সরকারের অনুমোদন বা ক্রেডেনশিয়াল গ্রহণের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। দিনেশ ত্রিবেদীর ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তাকে বা অন্য কোনো কূটনীতিককে নিয়ে এ ধরনের ভিত্তিহীন বিতর্ক তৈরি করা কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং দুই দেশের আস্থার পরিবেশ ধ্বংস করার গভীর চক্রান্ত।
সীমান্ত নিরাপত্তা, পানিবণ্টন, জ্বালানি ও বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এই সম্পর্ককে নস্যাৎ করার যেকোনো অপচেষ্টা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
শেষ কথা : দিনেশ ত্রিবেদী প্রত্যাহার বা ভারতবিরোধী উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড নিছক কিছু ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন আন্দোলন নয়, বরং এটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। এই ধরনের উগ্র তৎপরতাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রশ্রয় দেওয়া হলে তা শেষ পর্যন্ত দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থকেই মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে।
লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)
সম্পর্কিত সংবাদ
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও ‘ডু অর ডাই’ নীতিতে আওয়ামী লীগের অল-আউট প্রস্তুতি: তৃণমূলের চাঙ্গা ভাব ও সরকারের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ।
পার্বত্য জনপদের নতুন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি: অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ থেকে ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র
তারেক রহমানের জাপান সফর ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা: আস্থার সংকট এবং 'বিগ-ব্যাগ' উদ্যোগ এবং ভারত-বাংলাদেশ সংযোগের ভূরাজনীতি