রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

জাতীয়

২১ আগস্ট: রাষ্ট্রীয় মদদে রক্তে ভেজা বিভীষিকা, অসমাপ্ত রক্তগঙ্গার ওপর দাঁড়িয়ে আবার এক প্রতিরোধের ডাক

লিখেছেন: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৫ এএম
২১ আগস্ট: রাষ্ট্রীয় মদদে রক্তে ভেজা বিভীষিকা, অসমাপ্ত রক্তগঙ্গার ওপর দাঁড়িয়ে আবার এক প্রতিরোধের ডাক

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট—বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় লেখা এক নজিরবিহীন বর্বরতার দিন, এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের স্মারক। সেদিন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সংঘাত ঘটেনি; বরং পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা হয়েছিল এক নৃশংস ও নির্মম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে। প্রকাশ্য দিবালোকে, হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে রাজধানীর ঠিক কেন্দ্রস্থলে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড ও বন্দুক হামলা চালানো হয়েছিল। আর এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পুরো নীলক নকশা সাজিয়েছিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের লালিত উগ্রপন্থী জঙ্গি সংগঠনগুলো। সেই ভয়াবহ পরিকল্পনার মূল নেপথ্যে ছিল তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৮ বছর বিদেশে অবস্থান করার পর, নতুন এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে সে আজ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত।

দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১ আগস্টের সেই অভিশপ্ত বিকেলে পুলিশের পাহারা ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে জেএমবির উগ্রপন্থীরা তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার জনসভায় একের পর এক গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। গ্রেনেডের বিকট বিস্ফোরণ আর শত শত মানুষের করুণ আর্তনাদে সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। পুলিশ আহতদের উদ্ধারের বদলে আর্তনাদরত মানুষের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে আততায়ীদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিল। বিশ্ব ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এমন জঘন্য হত্যাযজ্ঞের নজির দ্বিতীয়টি নেই।

বাস্তবে ২১ আগস্টের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন আক্রমণ ছিল না। এটি ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অসমাপ্ত মিশন। ১৫ আগস্টের সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনাকে হত্যা করে পুরো নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। পরবর্তীকালে এই হামলার অন্যতম মূলহোতা মুফতি হান্নানের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, হাওয়া ভবনে অনুষ্ঠিত পরিকল্পনার গোপন বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর খুনি নম্বর এক মেজর নূর স্বয়ং উপস্থিত ছিল। আর হামলায় ব্যবহৃত ‘পিওএফ’ (পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি) চিহ্নিত আর্জেস গ্রেনেড সরাসরি এসেছিল পাকিস্তান থেকে, যা সরবরাহের মূল মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিল তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন। অত্যন্ত বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারে যাদের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বিচারাচারের নামে এটি এক চরম পরিহাস! উল্টো আজ বিচারের নামে নিরীহ মানুষকে সাজা দেওয়া হচ্ছে।

কী ঘটেছিল সেদিন? অন্য কোথাও জনসভার অনুমতি না পাওয়ায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসের সামনেই সমাবেশের আয়োজন করতে হয়েছিল। সেখানে স্থায়ী বা অস্থায়ী মঞ্চ করতে বাধা দেওয়ায় একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিকেল হতেই চারদিক থেকে মিছিলের স্রোত নামতে থাকে। বিকেল ৪টা নাগাদ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ৫টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছান শেখ হাসিনা। সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর অব্যাহত অত্যাচার ও দেশব্যাপী সিরিজ বোমাহামলা বন্ধে তৎকালীন সরকারকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। প্রায় ২০ মিনিটের বক্তব্য শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল শুরুর ঠিক আগের মুহূর্তে শুরু হয় নরকীয় সেই গ্রেনেড বৃষ্টি। একে একে ১৩টি আর্জেস-৮৪ গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ঘন ধোঁয়া ও রক্তে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

এরপর শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে শুরু হয় অবিরত গুলিবর্ষণ। কিন্তু দলের নিষ্ঠাবান নেতাকর্মীরা নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে প্রিয় নেত্রীকে ঘিরে মানববর্ম তৈরি করেন। এতে অনেকে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এবং মারাত্মক আহত হন, কিন্তু অলৌকিকভাবে রক্ষা পান শেখ হাসিনা। রক্তাক্ত রাস্তা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছিন্নভিন্ন মানবদেহ, আর বাতাসে পোড়া মাংসের গন্ধ—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেদিনের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২৪ আগস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মোট ২৪ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান এবং পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মোস্তাক আহমেদ সেন্টু, ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, রফিকুল ইসলাম আদা চাচা, সুফিয়া বেগম, হাসিনা মমতাজ রীনা, লিটন মুন্সী, রতন সিকদার, মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মামুন মৃধা, বেলাল হোসেন, আমিনুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, আতিক সরকার, নাসিরউদ্দিন সর্দার, রেজিয়া বেগম, আবুল কাসেম, জাহেদ আলী, মমিন আলী, শামসুদ্দিন, আবুল কালাম আজাদ, ইছহাক মিয়া ও অজ্ঞাতপরিচয় আরো দুজন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, আমির হোসেন আমুসহ অনেকেই সারাজীবনের জন্য শারীরিক যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে নেন।

ঘটনার পরপরই নিক্ষিপ্ত অবিস্ফোরিত তিনটি গ্রেনেড ধ্বংস করে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত মুছে ফেলা হয়। ‘জজ মিয়া’ নামের এক নিরীহ যুবককে ধরে এনে সাজানো নাটকের মাধ্যমে আসল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এমনকি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে দাবি করেছিলেন—শেখ হাসিনাই নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়ে নিজে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন!

শেখ হাসিনার ওপর এটিই প্রথম আক্রমণ ছিল না। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি একের পর এক পরিকল্পিত চক্রান্তের শিকার হয়েছেন:

• ২৪ জানুয়ারি, ১৯৮৮: চট্টগ্রাম লালদীঘি ময়দানে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালানো হয়। নেতাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে তাঁকে রক্ষা করলেও প্রাণ হারান ৭ জন এবং আহত হন তিন শতাধিক। • ১১ আগস্ট, ১৯৮৯: ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনে মধ্যরাতে ফ্রিডম পার্টির সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গুলিবর্ষণ ও গ্রেনেড হামলা জানায়। • ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৯১: উপনির্বাচনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকালে গ্রিন রোডে তাঁর ওপর অতর্কিত বোমাহামলা ও গুলিবর্ষণ করা হয়। • ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৪: নাটোর রেলস্টেশনে তাঁকে বহনকারী ট্রেন লক্ষ্য করে টানা গুলিবর্ষণ করা হয়। • ৭ ডিসেম্বর, ১৯৯৫: রাসেল স্কয়ারের সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় আবার তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালানো হয়। • ৭ মার্চ, ১৯৯৬: বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সভামঞ্চ লক্ষ্য করে একটি চলমান মাইক্রোবাস থেকে গুলি ছোড়া হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আগস্ট মাসটি এক বেদনাবিধুর ও রক্তঝরা অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের মধ্য-আগস্টে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আবার ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একই অপশক্তি দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে পাঁচ শতাধিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের উপস্থিতি জানান দিয়েছিল।

২০০১ থেকে ২০০৬ সালের জামায়াত-বিএনপি শাসনকালে সারাদেশে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছিল—মহিমা ও পূর্ণিমার মতো কিশোরীদের গণধর্ষণ, শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের মতো জঙ্গিদের দিয়ে পশ্চিমাঞ্চলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গাছে ঝুলিয়ে হত্যা—তা কোনোদিন মোছার নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষ আবারও সেই অপশাসনের শিকার। আজ আইনের শাসন অনুপস্থিত, মিথ্যা মামলায় যাকে খুশি জেলে পোরা হচ্ছে, মব বানিয়ে মানুষকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে এবং নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত বিচারব্যবস্থা প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

কেন বারবার এই জঘন্য হত্যাচেষ্টা? এটি মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার এক উদগ্র ও বাসনা। মুক্তিসংগ্রামের চেতনা, ১৯৭২ সালের সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও প্রগতিশীল আদর্শকে চিরতরে মুছে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্র। আজ আবারও সেই সময় এসেছে—বাঙালি জাতিকে একাত্তরের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে হবে এবং এই অপশক্তির বিষদাঁত চিরতরে ভেঙে দিতে হবে।

লেখক: ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন,সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা (The Source News Bangla)