রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

রাজনীতি

ঢাকার প্রত্যর্পণ চাপ বনাম দিল্লির ভূ-রাজনীতি: শেখ হাসিনা ইস্যুতে কেন ‘ধীরে চলো’ নীতিতে মোদী সরকার?

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ৭ আগস্ট ২০২৬, ৩:৫৩ পিএম
ঢাকার প্রত্যর্পণ চাপ বনাম দিল্লির ভূ-রাজনীতি: শেখ হাসিনা ইস্যুতে কেন ‘ধীরে চলো’ নীতিতে মোদী সরকার?

কূটনৈতিক দাবার চালে সতর্ক নয়াদিল্লি ,বাংলাদেশের পেশ করা আইনি দাবি আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির মারপ্যাঁচে এক অত্যন্ত জটিল ভারসাম্যের খেলা খেলছে ভারত। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর তীব্র চাপ থাকা সত্ত্বেও কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না নরেন্দ্র মোদী সরকার। বাহ্যিকভাবে আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার কথা বলা হলেও, এর নেপথ্যে কাজ করছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার এক সুদূরপ্রসারী কৌশল।

বাংলাদেশের আদালতে রায় বা আইনি পদক্ষেপের পর শেখ হাসিনাকে ফেরানোর যে আনুষ্ঠানিক আবেদন ঢাকায় তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে ভারত অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে পথ চলছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটির "প্রচলিত আইন এবং নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া" অনুসরণ করেই ঢাকার আবেদনটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এই প্রশাসনিক পর্যালোচনার আসল উদ্দেশ্য হলো সময় নেওয়া, যাতে মানবিক দায়বদ্ধতা, আন্তর্জাতিক নিয়ম এবং ঢাকা-নয়াদিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যতের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।

চার বড় সমীকরণ: যা হিসাব করছে মোদী সরকার

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তর বা না-করার সিদ্ধান্তটি কেবল সাধারণ কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তির (Extradition Treaty) ধারাক্রম নয়। এই সিদ্ধান্তের সাথে জড়িয়ে আছে চারটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ:

1. দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পথরেখা: বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও ঢাকার নতুন প্রশাসনের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা। 2. সীমান্ত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা: বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সীমান্ত নিরাপত্তায় কোনো হুমকি তৈরি করতে না পারে। 3. দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য: অঞ্চলে চীনসহ অন্যান্য পরাশক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে ভারতের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান ও প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখা। 4. মানবিক আশ্রয় ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা: রাজনৈতিক আশ্রয়ের ক্ষেত্রে ভারতের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং দীর্ঘদিনের মিত্রদের প্রতি নয়াদিল্লির বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা। সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট: উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার রাজনীতি

ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক ‘অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট’-এ কেন্দ্রের এই কৌশলী অবস্থান স্পষ্ট ধরা পড়েছে। কমিটির দেওয়া ৩৩টি সুপারিশের মধ্যে ২৫টি মোদী সরকার গ্রহণ করলেও, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানসংক্রান্ত বহুল আলোচিত ‘৫ নম্বর’ সুপারিশসহ মোট ৮টি স্পর্শকাতর প্রশ্নের চূড়ান্ত জবাব দেওয়া থেকে কেন্দ্র নিজেদের বিরত রেখেছে। এই নীরবতাই প্রমাণ করে যে, এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি বা অবস্থান প্রকাশ করতে নারাজ দিল্লি।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা ও দিল্লির ‘কৌশলী দূরত্ব’

ভারতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মন্তব্য বা অডিও বার্তা ঘিরে ঢাকায় যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, তা সামাল দিতে অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ নিয়েছে মোদী সরকার। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে প্রচারিত অডিও বক্তব্য কিংবা তাঁর যেকোনো সম্ভাব্য সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে—এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার সাথে ভারত সরকারের বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই। এর মাধ্যমে দিল্লি একদিকে যেমন হাসিনাকে সরাসরি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম না দেওয়ার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসছে না।

ঢাকার আইনি ও রাজনৈতিক দাবির মুখে ভারতের বর্তমান ‘ধীরে চলো’ নীতি মূলত এক বহুমাত্রিক কূটনৈতিক কৌশল। মোদী সরকার যেমন বাংলাদেশে তৈরি হওয়া নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারছে না, তেমনি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্রকে হস্তান্তরের মতো ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের প্রশাসনিক ও নীতিগত অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে চাইছে না। ফলে আইনি পর্যালোচনার অছিলায় কালক্ষেপণ করা এবং জল কতদূর গড়ায় তা পর্যবেক্ষণ করাই এখন দিল্লির প্রধান কৌশল।

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা