রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

অর্থনীতি

৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ,সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩৭৫৭ মেগাওয়াট; গ্রামে গড়ে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, প্লিজ শেখ হাসিনাকে পায়ে ধরে ফিরিয়ে আনুন ।

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৭ পিএম
৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ,সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩৭৫৭ মেগাওয়াট; গ্রামে গড়ে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, প্লিজ শেখ হাসিনাকে পায়ে ধরে ফিরিয়ে আনুন ।

এমন পরিস্থিতিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কামরাঙ্গীরচরের অধিবাসী জয়তুর বিবি আকুতি জানিয়ে বলেন, "এখানে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, শেখ হাসিনাকে পায়ে ধরে ফিরিয়ে আনুন। গ্রামের মানুষ, নারীরা চিৎকার করে বলছেন শেখ হাসিনা থাকতে, ঝড়ে তুফানেও বিদ্যুৎ থাকতো। বিল কম আসতো। গরীবের জন্য কম বিল। ইবলিশের বাচ্চারা হেরে খেদাইয়া না দেয় বিদ্যুৎ না দেয় খাওন..., গরীব মানুষ বাচে কেমনে? দয়া ক্ইইরা হেরে পায়ে ধইরা, তওবা কইরা, তারে ফিরাইয়া আনেন..., তইলে দেশের শান্তি, আমরাও জানে বাচি।" তাঁর এই বক্তব্যই বর্তমান বিদ্যুৎসংকটের ভয়াবহতা ও সাধারণ মানুষের সীমাহীন কষ্টের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

বিগত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে অভাবনীয় অবকাঠামোগত বিপ্লব ঘটেছে। শতভাগ বিদ্যুৎায়ন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রিড সম্প্রসারণ, শত শত মেগাওয়াট সক্ষমতার আধুনিক পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইন নির্মাণের মাধ্যমে দেশীয় জ্বালানি খাতকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অনিশ্চয়তা, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি জটিলতা এবং কয়লা পরিবহনে বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এক সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়েছে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প খাতে।

মেগা-অবকাঠামোর বিশাল সম্ভাবনা ও বর্তমান সংকটের চিত্র

আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদের সবচেয়ে সাফল্যমণ্ডিত খাতের একটি ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। কয়লাভিত্তিক পায়রা, রামপাল, এলএনজিভিত্তিক বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বেসরকারি খাতের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। তবে বর্তমান চিত্রটি এই সম্ভাবনার সাথে সাময়িক বৈপরীত্য তৈরি করেছে: • উৎপাদন বন্ধ ও আংশিক সক্ষমতা: দেশে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামত ও সরাসরি জ্বালানি সংকটের কারণে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা কেন্দ্রগুলোও জ্বালানির অভাবে তাদের সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না।

• রেকর্ড লোডশেডিং: সামপ্রতিক সময়ে গ্রিডে সরবরাহের ঘাটতি বেড়ে গিয়ে গড়ে প্রায় ৩,০০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। গত রোববার দিবাগত রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং রেকর্ড করা হয় ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট।

• পূর্ববর্তী রেকর্ডের রূপরেখা: ২০২৩ সালের ২৭ জুন আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদের অন্যতম সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩,৪১৯ মেগাওয়াট। বর্তমানের ঘাটতি সেই সূচককেও অতিক্রম করেছে।

জ্বালানি সরবরাহের দ্বিমুখী চাপ: গ্যাস ও কয়লা ঘাটতি

বিদ্যুৎ খাতের আধুনিক অবকাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক জ্বালানির (Primary Energy) অপ্রতুলতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সাময়িকভাবে থমকে গেছে। গ্যাস সংকট ও এলএনজি টার্মিনালের অচলাবস্থা

• চাহিদা ও সরবরাহের ফারাক: গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক ২৫২ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে, যা চাহিদার তিন-একংশের চেয়েও কম। ফলে একসময় গ্যাস দিয়ে যেখানে প্রায় ৫,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলত, তা বর্তমানে কমে ৩,৫০০–৪,০০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

• ভাসমান টার্মিনালের ক্ষয়ক্ষতি: গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে ‘এক্সিলারেট এনার্জি’র এফএসআরইউ (FSRU) ক্ষতিগ্রস্ত হলে দৈনিক ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে আংশিক মেরামতের পর ২৫ কোটি ঘনফুট পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় ফিরতে পেট্রোবাংলার আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। কয়লা খালাস ও বৈরী আবহাওয়ার ধাক্কা

• পটুয়াখালী ও আদানি পাওয়ার: ১,২০০ মেগাওয়াটের পটুয়াখালী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনে সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে; কুতুবদিয়ায় বড় জাহাজ থেকে কয়লা খালাসে অতিরিক্ত সময় লাগছে। একইসাথে, ভারতের ঝাড়খণ্ডে বন্যার কারণে কয়লা ভিজে যাওয়ায় আদানি পাওয়ার থেকে সরবরাহ ১,৪০০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৮০০–১,০০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

• সক্ষমতা বনাম উৎপাদন: কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ৭,৯৪৫ মেগাওয়াট হলেও রামপাল ও বড়পুকুরিয়ায় প্রযুক্তিগত ও কয়লা ঘাটতির কারণে বর্তমানে প্রায় ৫,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।

৩. জনজীবন ও অর্থনীতিতে সাময়িক প্রভাব

উৎপাদন ঘাটতির প্রধান খেসারত দিতে হচ্ছে পল্লী এলাকা ও প্রান্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যকে:

• জনভোগান্তি: গ্রামীণ এলাকায় দিন-রাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। প্রচণ্ড তাপদাহে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও হাসপাতালের রোগীদের জীবনযাত্রা চরম ব্যাহত হচ্ছে।

• শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা: রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সিলেটের শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। জেনারেটরে তেল ব্যবহারের কারণে উৎপাদনে খরচ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উৎপাদন লাইন বারবার বন্ধ হওয়ায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শিল্প মালিকরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। ৪. সংকট উত্তরণে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা ও সময়সূচি

বিদ্যুৎ ঘাটতি সামলাতে সরকার ও বিদ্যুৎ বিভাগ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে: • জরুরি গ্যাস পুনঃবণ্টন: বিদ্যুৎ সচিবের হস্তক্ষেপে পেট্রোবাংলা থেকে দ্রুত উৎপাদনে যেতে সক্ষম কেন্দ্রগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। • তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন (HFO/HSD): গ্যাস ও কয়লার শূন্যতা পূরণে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক প্ল্যান্টগুলো চালু করা হয়েছে। যদিও এতে ভর্তুকি ও পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, তবু লোডশেডিং সীমিত রাখতে একে জরুরি সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। • অবকাঠামোগত গতিশীলতা: আড়াইহাজারে নির্মাণাধীন ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র দ্রুত চালুর লক্ষ্যে কোরীয় প্রকৌশলী দলকে যুক্ত করার কাজ চলছে, যা চালুর পর ভূলতা গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। • আশাবাদ: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (PDB) এবং পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, এলএনজি টার্মিনালে পূর্ণ সরবরাহ ফিরলে এবং কয়লা আনলোডিং স্বাভাবিক হলে আগামী ২–৩ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটবে। • ১. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গতি: আমদানিকৃত এলএনজি ও আন্তর্জাতিক বাজারের ঘনঘন মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি থেকে বাঁচতে দ্রুত দেশীয় অফশোর ও অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানে অর্থায়ন বাড়াতে হবে।

২. নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ: রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র চালুর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডে বেস-লোড সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

৩. সঞ্চালন লাইন সংস্কার: জাতীয় গ্রিড চালুর পাশাপাশি স্থানীয় অঞ্চলের উপকেন্দ্র (যেমন আড়াইহাজারের কাজ) দ্রুত শেষ করে বিদ্যুৎ বিতরণের অপচয় ও কারিগরি ত্রুটি কমাতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের হাত ধরে বিদ্যুৎ খাতে যে অভূতপূর্ব সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটটি প্রধানত অবকাঠামোগত ব্যর্থতা নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার এক সাময়িক অচলাবস্থা। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে কৌশলগত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে খুব দ্রুতই এই অচল অবস্থা কেটে যাবে এবং দেশের বিদ্যুৎ খাত পুনরায় পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে আসবে।

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, সাংবাদিক,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রধান সম্পাদক,দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা