রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

অর্থনীতি

লাশের গন্ধ, পোড়া কঙ্কাল আর ১৮২টি পরিবারের কান্না : গাজী টায়ার্স ট্র্যাজেডি কি তবে শুধুই সংখ্যা?

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ৭ আগস্ট ২০২৬, ৯:৫৯ এএম
লাশের গন্ধ, পোড়া কঙ্কাল আর ১৮২টি  পরিবারের  কান্না : গাজী টায়ার্স ট্র্যাজেডি কি তবে শুধুই সংখ্যা?

নারায়ণগঞ্জের রূপসী গ্রামের আকাশটা আজও ভারী। সেখানে কোনো এক অচেনা পোড়া গন্ধ বাতাসকে স্তব্ধ করে রাখে প্রতিদিন। সামনে দাঁড়ানো ছাই ও অঙ্গার হওয়া ছয়তলা ভবনটি যেন এখন কোনো কারখানা নয়—একটি দানবীয় গণকবর। ২০২৪ সালের আগস্টের সেই অভিশপ্ত রাতের পর দুই বছর গড়িয়ে গেছে, কিন্তু কারখানার পোড়া ইট-পাথরের ফাঁকে ফাঁকে এখনও আটকে আছে ১৮২টি তাজা প্রাণ, ১৮২টি পরিবারের বুকফাটা হাহাকার। তারা কি নিখোঁজ, নাকি ধোঁয়ার সাগরে মিলিয়ে যাওয়া লাশ—প্রশাসনের কাছে তার কোনো স্পষ্ট হিসাব নেই। তাদের কাছে এই ১৮২ জন হয়তো শুধুই একটি কাগজের খসড়া সংখ্যা, কিন্তু স্বজনদের কাছে তারা ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

অঙ্গার হওয়া রাত ও বন্দি নিঃশ্বাস

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক পর। সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন কারখানাটিতে চলে তাণ্ডব ও লুটপাট। এরপর ২৫ আগস্ট রাতে গাজীর গ্রেপ্তারের খবর ছড়ালে আবারো বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। শত শত পথচলতি মানুষ, কৌতূহলী জনতা কিংবা সুযোগসন্ধানীরা কারখানার ভেতরে ঢুকে পড়ে। অভিযোগের আঙুল ওঠে একদল নির্দয় দুর্বৃত্তের দিকে—যারা ভবনের নিচতলায় দাউদাউ করে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে ভারী তালা ঝুলিয়ে দেয়।

ভেতরে আটকে পড়া মানুষগুলোর রূপসী আকাশ কাঁপানো আর্তনাদ পৌঁছায়নি কারো কানে। কেমিক্যাল আর দাহ্য কাঁচামালের গ্রাসে আগুন জ্বলেছে টানা পাঁচ দিন। ছয়তলা ভবনের ছাদ ধসে পড়েছে, দেয়াল ফেটে চৌচির হয়েছে, আর ভেতরে জীবিত মানুষগুলো ধূপের মতো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। যখন ফায়ায় সার্ভিস গুনে গুনে ১০০ ছাড়াল, রহস্যজনকভাবে গণনার খাতা বন্ধ হয়ে গেল। পরে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা তালিকা করে চূড়ান্ত সংখ্যাটি পেল—১৮২ জন!

কঙ্কাল কুড়ানোর হাহাকার এবং প্রশাসনের অমানবিক নীরবতা ভবন ধসে পড়ার অজুহাতে যখন সরকারি উদ্ধার অভিযান গুটিয়ে নেওয়া হলো, তখন বুকভাঙা স্বজনরা প্রাণের মায়াকে উপেক্ষা করে নিজেরাই নেমে পড়েছিলেন সেই জ্বলন্ত নরকে। তারা কারখানার ছাই আর ধ্বংসস্তূপ থেকে কুড়িয়ে এনেছিলেন পোড়া কঙ্কাল ও মানুষের হাড়গোড়—কেবল একফোঁটা ডিএনএ পরীক্ষার আসায়, যাতে অনন্ত স্বজনের শেষ চিহ্নটুকু বুঝে নিয়ে নদীর পাড়ে কিংবা পারিবারিক গোরস্থানে একটু দাফন করা যায়।

কিন্তু প্রশাসনের বিবেক যেন কারখানার দেয়ালের চেয়েও বেশি শক্ত হয়ে জমাট বেঁধে আছে। নারায়ণগঞ্জ জেলার তৎকালীন ডিসির গঠিত আট সদস্যের কমিটি ৩২ পৃষ্ঠার ভারী প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। ১০টি সুপারিশে পরিষ্কার বলা হয়েছিল—ভবন ভেঙে উদ্ধার কাজ চালান, ডিএনএ টেস্ট করুন, মৃতদেহের অবশেষ পরিবারের হাতে তুলে দিন।

অথচ বাস্তবে একটি সুপারিশও কাগজের পৃষ্ঠা থেকে মাটিতে নামেনি। স্বজনরা যখন ডিসি কিংবা এসপি অফিসে ছোটাছুটি করেন, তখন জোটে অবহেলা আর দূর-দূর ছাই-ছাই আচরণ। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক যে মন্তব্য করেছেন, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে শিউরে ওঠাবে। তিনি নির্দ্বিধায় জানান, ‘কেউ এসে দাবি করেনি, তাই ডিএনএ পরীক্ষা করানো হয়নি!’ যে স্বজনরা থানায় আর অফিসে ঘুরে রক্তাশ্রু ফেলছেন, তাদের উপস্থিতি প্রশাসন কীভাবে অস্বীকার করে—সে প্রশ্ন আজ পুরো বিবেকবান সমাজের।

একটি সাবানের কারখানা আর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন

দুই ভাই সাব্বির ও শাহাদাত সিকদার, আর তাদের ভগ্নিপতি জমীর আলী—একই পরিবারের তিন উপার্জনক্ষম মানুষ সেই রাতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন। তাদের বোন সিনথিয়ার চোখ দুটো এখন শুকিয়ে কাঠ। ঘরের হাড়ি জ্বালাতে তিনি একটি সাবান কারখানায় কাজ নিয়েছিলেন, কিন্তু অসুস্থ ভাগ্নের দেখভালের জন্য একটু ছুটি চাওয়াতেই খোয়া গেছে সেই কাজও। সিনথিয়ার শূন্য কন্ঠের হাহাকার প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখে এক বিরাট থাপ্পড়:

"পুলিশ আর ডিসির দরজায় ঘুরতে ঘুরতে আমাদের পায়ের ছাল উঠে গেছে। তারা আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না, মনে হয় আমরা মানুষই না! আমাদের স্বজনরা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে—এটুকু জানার অধিকারও কি আমাদের নেই?"

একই যন্ত্রণা সুনামগঞ্জ থেকে আসা জাকির হোসেনের। ভাই মনিরকে খুঁজতে এসে প্রশাসনের হাত গুটিয়ে রাখা দেখে তিনি নিজেই পোড়া কারখানায় নেমে হাড়গোড় কুড়িয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আজ সেই হাড়গোড়ের কী হলো, তা কেউ জানে না। নিখোঁজদের মোবাইলের সিগন্যাল ট্র্যাক করার ও 'তদন্ত শেষ পর্যায়ে' থাকার বাঁধাধরা বুলি আউড়ে নিজেদের দায়িত্ব পার করছেন জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তারা।

বিবেকের কাছে প্রশ্ন

শত শত কোটি টাকার কারখানা ছাই হয়ে গেছে, তা নিয়ে হয়তো পুঁজিবাদী হিসাব-নিকাশ শেষ। কারখানার মালিক কারাবন্দি। কিন্তু ১৮২টি মানুষের জীবন আর তাদের ওপর নির্ভরশীল হাজারো মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানের চোখের জল কি কোনো হিসাবের মধ্যে পড়ে না? ১৮২ জন রক্তমাংসের মানুষ কি শুধু একটি 'অমিমাংসিত ফাইল' কিংবা 'পরিসংখ্যানের সংখ্যা' হয়েই থাকবে?

লাশের গন্ধ আর পোড়া হাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাজী টায়ার্সের সেই ধ্বংসস্তূপ আজ নারায়ণগঞ্জকে নয়, পুরো জাতিকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে—আমরা কি সত্যিই মানুষ, নাকি আমাদের মানবতাও সেদিন রূপসীর সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে?

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা