শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

অর্থনীতি

৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের খাবারে স্বপ্নভঙ্গ: স্বাস্থ্যকর খাদ্য যখন নাগালের বাইরে, রাজনীতির সামনে কত বড় প্রশ্ন?

লিখেছেন: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১:৩১ পিএম
৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের খাবারে স্বপ্নভঙ্গ: স্বাস্থ্যকর খাদ্য যখন নাগালের বাইরে, রাজনীতির সামনে কত বড় প্রশ্ন?

বাংলাদেশে ক্ষুধার চিত্র হয়তো আগের মতো সরাসরি দৃশ্যমান নয়। কিন্তু তার চেয়েও গভীর এক সংকট ধীরে ধীরে সমাজের ভেতরে শেকড় গেড়ে বসছে—মানুষ খাবার পাচ্ছে, কিন্তু সেই খাবার কতটা পুষ্টিকর, কতটা স্বাস্থ্যকর, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য যেন সেই অদৃশ্য সংকটের পর্দাই সরিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথভাবে প্রকাশিত The State of Food Security and Nutrition in the World 2026 প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ৩৮.৬ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সংখ্যার হিসাবে এই মানুষ প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ। অর্থাৎ দেশের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় দুজন এমন একটি বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করছেন, যেখানে পেট ভরানোর খাবার হয়তো জোটে, কিন্তু শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করার মতো খাবার নিয়মিত কেনা সম্ভব হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। পাকিস্তানে স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্যহীন মানুষের হার ৬৩ শতাংশ। সেই তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে এমন একটি দেশে, যেখানে গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমেছে, খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে এবং মানুষের গড় আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে—সেখানে কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে না পারা অর্থনীতির ভেতরে থাকা বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। খাবার আছে, কিন্তু পুষ্টি নেই—এ কেমন উন্নয়ন? জাতিসংঘের হিসাবে, একজন মানুষের প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার গড় খরচ বাংলাদেশে ২০১৭ সালের ৩.০৯ ডলার পিপিপি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৪.৫৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আট বছরে স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই খাদ্যতালিকায় শুধু ভাত বা শর্করাজাতীয় খাবার নয়; প্রয়োজনীয় প্রাণিজ আমিষ, মাছ-মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম ও বীজসহ বিভিন্ন খাদ্যগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত। বাস্তবতা হলো, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক আয়ের বড় অংশ যেখানে চাল, ডাল, তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে চলে যায়, সেখানে নিয়মিত মাছ, মাংস, দুধ, ফল ও পর্যাপ্ত সবজি কেনা অনেক পরিবারের জন্য বিলাসিতার কাছাকাছি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেই বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ। একসময় প্রশ্ন ছিল—মানুষের ঘরে খাবার আছে কি না। এখন প্রশ্নটি আরও গভীর: মানুষ যে খাবার খাচ্ছে, তা কি তাকে সুস্থ রাখার জন্য যথেষ্ট? তবে প্রতিবেদনের একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ৬২.৮ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্য কিনতে অক্ষম ছিলেন। ২০২৫ সালে সেই হার কমে ৩৮.৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য এখনও আর্থিকভাবে অধরা—এই বাস্তবতা উন্নয়নের সাফল্যকে নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। এ সংকট শুধু অর্থনীতির নয়, রাজনীতিরও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের অপ্রাপ্যতা এখন আর কেবল পুষ্টিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি সরাসরি রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন। কারণ খাদ্যের দাম, মানুষের আয়, বাজারব্যবস্থা, কৃষিনীতি, আমদানি-রপ্তানি, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মূল্যস্ফীতি—সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত। যখন একটি পরিবারের আয় বাড়ার চেয়ে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ে, তখন সেই পরিবার প্রথমেই খাবারের তালিকা থেকে তুলনামূলক ব্যয়বহুল পুষ্টিকর পণ্য বাদ দেয়। মাছ-মাংস কমে যায়, ফল কেনা বন্ধ হয়, দুধের ব্যবহার কমে, শাকসবজির বৈচিত্র্যও সীমিত হয়ে আসে। এর তাৎক্ষণিক প্রভাব হয়তো রাজনৈতিক পরিসরে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, কর্মক্ষমতা, স্বাস্থ্যব্যয় এবং সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে। ফলে আগামী দিনের রাজনীতিতে ‘খাদ্য নিরাপত্তা’ থেকে ‘পুষ্টি নিরাপত্তা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি যদি ক্রমাগত অনুভব করে যে আয় বাড়লেও জীবনযাত্রার মান বাড়ছে না, তাহলে তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা—এসব প্রশ্ন আগামী দিনে সরকারের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত হতে পারে। ‘মূল্যস্ফীতি’ তখন আর শুধু অর্থনীতির শব্দ থাকবে না বাংলাদেশের রাজনীতিতে মূল্যস্ফীতি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কিন্তু স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এই আলোচনাকে আরও গভীর মাত্রা দিতে পারে। কারণ একজন মানুষ যদি বাজারে গিয়ে শুধু চাল-ডাল কিনতে পারেন, কিন্তু পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পারেন, তাহলে সেটিকে কেবল মূল্যস্ফীতির সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তব সংকটের পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। এখানে রাজনৈতিক প্রশ্নটি হবে—রাষ্ট্র কি শুধু মানুষের পেট ভরানোর নিশ্চয়তা দেবে, নাকি সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারও নিশ্চিত করবে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে সরকারকে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলা করতে হবে। জাতিসংঘের সুপারিশ অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় কমানো, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বাড়ানো, বাজারের তথ্যপ্রবাহ উন্নত করা এবং খাদ্য অপচয় কমানো—এসব পদক্ষেপ এখন শুধু অর্থনৈতিক নীতির অংশ নয়; এগুলো রাজনৈতিক অঙ্গীকারেরও বিষয়। আগামী নির্বাচনে কি ‘খাবারের দাম’ হয়ে উঠবে বড় ইস্যু? বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন যতই সামনে এগোবে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ততই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হতে পারে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বাজারে মাছ-মাংস, ডিম, দুধ, সবজি ও ফলের দামও ভোটারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। কারণ রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে ক্ষুধা বা অপুষ্টি দূর করা যায় না। একটি পরিবারের শিশুর জন্য দুধ কেনা সম্ভব হচ্ছে কি না, মা নিয়মিত ফল খেতে পারছেন কি না, পরিবারের সদস্যরা পর্যাপ্ত আমিষ পাচ্ছেন কি না—এসব বাস্তব অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি মানুষের আস্থাকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্যহীন ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের সংখ্যা তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি এমন এক নীরব রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা এখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ মানুষের ভোটের আগে তার খাবারের থালা বদলায়। আর সেই থালায় যদি পুষ্টি কমতে থাকে, তাহলে একসময় তার প্রতিধ্বনি ব্যালট বাক্সেও শোনা যেতে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো নয়; এমন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে দেশের মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মতো খাবারও কিনতে পারে। यही হবে উন্নয়নের পরবর্তী বড় পরীক্ষা—এবং একই সঙ্গে রাজনীতিরও।

লেখক: ড.আবুল হাসনাৎ মিল্টন, প্রধান সম্পাদক, দ্যা সোর্স নিউজ বাংলা