মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

অর্থনীতি

রাজনৈতিক বৈরিতার বলিকাঁঠায় জাতীয় অর্থনৈতিক বিকাশ: সামিটের ওপর খড়্গ ও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

লিখেছেন: মোহাম্মদ আলী আরাফাত, রাজনীতিবিদ,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক মন্ত্রী প্রকাশিত: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ৩:৫৫ পিএম
রাজনৈতিক বৈরিতার বলিকাঁঠায় জাতীয় অর্থনৈতিক বিকাশ: সামিটের ওপর খড়্গ ও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের রূপকার হিসেবে পরিচিত বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সামিট গ্রুপ আজ এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক নিপীড়ন ও প্রশাসনিক প্রতিশোধের মুখোমুখি। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করতে এবং জাতীয় বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বছরের পর বছর ধরে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে আসা এই বৃহৎ প্রাতিষ্ঠানিক গোষ্ঠীর ওপর একের পর এক নেমে আসছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আঘাত। সামিটের দ্বিতীয় ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) সম্পর্কিত চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করা এবং একই সাথে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার সিদ্ধান্ত কেবল একটি শিল্পগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতকে এক গভীর ও অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

চুক্তি বাতিল ও মানবিক ধাক্কা

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্দেশে পেট্রোবাংলা সামিটের সাথে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি টার্মিনাল চুক্তিটি বাতিল করে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৩০ মার্চ শেখ হাসিনা সরকারের আমলে অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং দেশের জ্বালানি চাহিদার দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পেট্রোবাংলা ও সামিট যৌথভাবে একটি টার্মিনাল ব্যবহার চুক্তি, বাস্তবায়ন চুক্তি এবং ১৫ বছর মেয়াদী (২০২৬ থেকে প্রতি বছর ১.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহ) চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।

বহু বছরের বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিকে এক নিমিষে ধূলিসাৎ করে দিয়ে কোনো প্রকার যৌক্তিক কারণ দর্শানো ছাড়াই এই চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। সামিট গ্রুপের পক্ষ থেকে হতাশা প্রকাশ করে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে তাদের একটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও অনুকরণীয় রেকর্ড রয়েছে। প্রশাসনিক এই খামখেয়ালি ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা আইনি পর্যালোচনার আবেদন জানাবে।

অর্থনৈতিক অবরুদ্ধকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ক্ষতি

প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান, তাঁর ভাই সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান, বিআইপিপিএ-এর সভাপতি ফয়সাল খানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ব্যাংক হিসাব এক মাসের জন্য স্থগিত করেছে। কেবল ব্যক্তিগত হিসাবই নয়, তাঁদের মালিকানাধীন প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টগুলোর লেনদেনও স্থগিত করা হয়েছে।

একই সাথে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের অন্যতম শীর্ষ এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হস্তান্তর স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়েছে। এ ধরনের কঠোর ও একপেশে পদক্ষেপের ফলে হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রকৌশলী এবং শ্রমিকের জীবিকা আজ চরম হুমকির মুখে। দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটির ওপর এই বৈরী আচরণ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে।

বিদ্যুৎ সংকট ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ

সামিট বর্তমানে দেশে সচল দুটি এফএসআরইউ-এর একটি অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালনা করছে এবং জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে আসছে। এই অবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত দ্বিতীয় এফএসআরইউ চুক্তি বাতিল করায় দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়ল।

অনির্বাচিত ইউনূস সরকারের এই হঠকারী ও প্রতিশোধমূলক সিদ্ধান্তের মাশুল গুণতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে। যে সময় দেশের কলকারখানা এবং বাসাবাড়িতে জ্বালানি সংকট প্রকট, সে সময় একটি অভিজ্ঞ ও দক্ষ দেশীয় প্রতিষ্ঠানের হাত বেঁধে দেওয়া কোনো সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক কৌশল হতে পারে না। এই একতরফা সিদ্ধান্তের কারণে আগামী দিনগুলোতে দেশকে চরম বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হতে হবে, যা ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে রাজনৈতিক ডামাডোলের উর্ধ্বে রাখা একটি দেশের টিকে থাকার মূল শর্ত। অথচ সামিট গ্রুপের প্রতি সরকারের এই বিমাতাসুলভ আচরণ ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ দেশের বেসরকারি বিনিয়োগের আস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক জিঘাংসার শিকার হয়ে আজ মুখ থুবড়ে পড়ছে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং তার সাথে জড়িত লাখো মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা।

লেখক: মোহাম্মদ আলী আরাফাত, রাজনীতিবিদ,রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক মন্ত্রী