রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

প্রাথমিক শিক্ষা—ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির ভিত্তি- শেখ হাসিনার উন্নয়ন ভাবনা–৩

লিখেছেন: নীহারিকা রায়, উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ৪:১১ পিএম
প্রাথমিক শিক্ষা—ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির ভিত্তি- শেখ হাসিনার উন্নয়ন ভাবনা–৩

দুনিয়া বদলে গেছে—বদলে গেছে দেশ, মানুষ, সমাজ এবং মানুষের চাহিদা, রুচি ও পছন্দ-অপছন্দ। পরিবর্তিত এই বিশ্বব্যবস্থায় পিছিয়ে না পড়তে হলে মানুষকে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান অর্জন, প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হচ্ছে। উন্নয়নপ্রত্যাশী দেশগুলো তাই গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নয়নে উপযুক্ত ও কার্যকর শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর সেই শিক্ষার ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক স্তরেই।

কারিকুলাম ও সিলেবাসঃ শিক্ষা বলতে সাধারণত আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত কারিকুলাম ও সিলেবাস অনুযায়ী পাঠদানের চিত্র। সহজভাবে বললে, কারিকুলাম হলো শিক্ষার সামগ্রিক লক্ষ্য, কাঠামো ও দিকনির্দেশনা; আর সিলেবাস হলো নির্দিষ্ট কোনো বিষয় বা কোর্সে কী কী পড়ানো হবে তার বিস্তারিত পাঠ্যসূচি।

অর্থাৎ কারিকুলাম যদি হয় একটি রাস্তার মানচিত্র, সিলেবাস হলো সেই পথে চলার নির্দিষ্ট ধাপ বা মাইলফলক।

একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন এবং সমাজের চাহিদা পরিবর্তিত হয়। তাই কারিকুলাম ও সিলেবাসকেও নিয়মিত পর্যালোচনা ও প্রয়োজন অনুযায়ী হালনাগাদ করা জরুরি।

বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-সহ নতুন নতুন প্রযুক্তি যখন আমাদের জীবন ও কর্মক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন আনছে, তখন শিক্ষাব্যবস্থাকেও ভবিষ্যতের চাহিদার কথা মাথায় রেখে সাজাতে হবে।

শিশুকালেই শিক্ষার ভিত গড়ে তুলতে হবেঃ শিশুকাল শেখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। ভাষা, গণিত, যুক্তিবোধ, সমস্যা সমাধান, সামাজিক আচরণ ও সৃজনশীলতার মতো মৌলিক দক্ষতার ভিত্তি যত আগে তৈরি করা যায়, পরবর্তী শিক্ষাজীবনে তার সুফল পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি।

শিশুরা ছোট বয়সে নতুন শব্দ, উচ্চারণ ও ভাষার ধ্বনি তুলনামূলক সহজে আয়ত্ত করতে পারে। তাই মাতৃভাষার পাশাপাশি বয়স ও পরিবেশ উপযোগীভাবে অন্য ভাষার সঙ্গেও তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে ভাষা শেখার ক্ষেত্রে শুধু বয়স নয়—শিক্ষার পরিবেশ, অনুশীলনের সুযোগ, শিক্ষক ও পরিবারের সহায়তা এবং শিশুর আগ্রহও গুরুত্বপূর্ণ।

গণিতের ক্ষেত্রেও ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ তৈরি করা প্রয়োজন। গণিতকে শুধু বইয়ের কঠিন অঙ্ক হিসেবে উপস্থাপন না করে প্রকৃতি, খেলা ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে শেখানো গেলে শিশুর কাছে বিষয়টি অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

প্রকৃতির বিভিন্ন বিন্যাস, স্থাপত্যের অনুপাত, সংগীতের ছন্দ, সময়ের হিসাব, কেনাকাটা, ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই গণিতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবহার রয়েছে। গ্রহ-নক্ষত্রের গতি থেকে শুরু করে পদার্থবিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও গণিতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরেই গণিতের সগর্ব উপস্থিতির প্রমাণ তাদের দেখিয়ে দিলে ভয় দূর হবে, গণিত শিখতে সবাই আগ্রহী হবে। এসব বাস্তব উদাহরণ শিশুর সামনে তুলে ধরতে পারলে গণিতের প্রতি ভয় কমিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব।

প্রযুক্তিশিক্ষার সূচনা হোক শৈশবেইঃ বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। তাই শিশুকাল থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা প্রয়োজন। বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী যুক্তি, সমস্যা সমাধান, গেমভিত্তিক শিক্ষা ও প্রাথমিক কোডিংয়ের মাধ্যমে তাদের প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করানো যেতে পারে।

পরবর্তী পর্যায়ে কম্পিউটারের মৌলিক ধারণা, ডিজিটাল দক্ষতা, রোবোটিক্স, হার্ডওয়্যার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাথমিক ধারণার সঙ্গেও তাদের পরিচিত করা সম্ভব।

তবে প্রযুক্তিশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু কম্পিউটার চালানো শেখানো নয়। প্রযুক্তিকে কীভাবে জ্ঞান অনুসন্ধান, গবেষণা, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ ও সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করা যায়—সেই দক্ষতা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল কনটেন্ট, ই-লার্নিং এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশকেও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়ঃ প্রাথমিক শিক্ষা শুধু বাংলা, ইংরেজি, গণিত কিংবা বিজ্ঞানের পাঠ নয়। শিশুর চরিত্র, আচরণ, সামাজিক দক্ষতা ও মূল্যবোধের ভিত্তিও এই সময়েই গড়ে ওঠে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় খেলাধুলা, গল্প, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও দলগত কাজের মাধ্যমে শিশুদের অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিশুকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে সে ভুল করতে ভয় না পেয়ে ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে। কারণ ভুলকে শুধু ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে শিশুর সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বরং ভুল বিশ্লেষণ করে সঠিক পথ খুঁজে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে তার সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ে।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় উদ্যোগঃ বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

এর মধ্যে Primary Education Development Programme বা PEDP ছিল অন্যতম বৃহৎ কর্মসূচি। এর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করা হয়েছে। PEDP-4-এর মেয়াদ ছিল জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে জাপানের JICA-ও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষণ উপকরণ ও শিক্ষণ-পদ্ধতির উন্নয়নে এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, উপস্থিতি বাড়ানো এবং পুষ্টির সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচিও চালু করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় নতুন বিদ্যালয় স্থাপন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

জরাজীর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর জন্যও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ‘Next-Gen Primary Program’-এর মতো পরিকল্পনায় শিক্ষক ও স্কুল নেতৃত্বের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার প্রথম ধাপঃ একটি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ভিত্তি তার মানুষ। আর দক্ষ মানুষ তৈরির প্রথম ধাপ হলো মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা।

শিশুকে শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার উপযোগী করে তুললেই হবে না; তাকে হতে হবে কৌতূহলী, যুক্তিবাদী, সৃজনশীল, প্রযুক্তিসচেতন, দায়িত্বশীল এবং নতুন কিছু শেখার জন্য আগ্রহী।

শেখ হাসিনার উন্নয়ন-ভাবনায় প্রাথমিক শিক্ষাকে তাই শুধু বিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠদান হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ পরিচালনা করবে। তাই তাদের শিক্ষা, চিন্তা ও দক্ষতার ভিত যত শক্তিশালী হবে, আগামী দিনের বাংলাদেশও তত শক্তিশালী হবে।

নীহারিকা রায়, উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট