শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

বঙ্গবন্ধুর গ্রামীণ শহর ও শেখ হাসিনার উন্নয়ন ভাবনা–২

লিখেছেন: নীহারিকা রায়, উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ৫:১৯ এএম
বঙ্গবন্ধুর গ্রামীণ শহর ও শেখ হাসিনার উন্নয়ন ভাবনা–২

গ্রাম নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন অচিরেই বাস্তবায়িত হবে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। অদূর অতীতে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন—“প্রতিটি গ্রামে আমরা শহরের সব সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে চাই।” অর্থাৎ, প্রতিটি গ্রামই গড়ে উঠবে একেকটি উন্নত ‘গ্রামীণ শহর’ হিসেবে। পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় শেখ হাসিনা তাঁর সেই অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হননি; বরং সময়োপযোগী পরিকল্পনার মাধ্যমে এতে নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত করছেন। তবে পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে দেশের অগ্রগতির পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ। শিল্পায়ন ও দ্রুত নগরায়ণের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জমি। ফলে শহর, নগর, কারখানা ও সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে কৃষিজমির পরিমাণ। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা সমস্যা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত; আর এসব সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে আবাদি জমির টেকসই সংরক্ষণ।

বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী ভাবনা ও ‘কন্ডোমিনিয়াম’ মডেল

স্বাধীনতার পরপরই দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু এই অনাগত সংকট উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই কৃষিজমি রক্ষা করে ‘গ্রামীণ শহর’ গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। এ উদ্দেশ্যে একটি প্রতিনিধি দলকে ইউরোপের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য পাঠানো হয়, যাতে ইউরোপীয় দেশগুলো কীভাবে কৃষি ও পরিবেশ রক্ষা করে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তুলেছে, সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। সফর শেষে প্রাপ্ত সুপারিশের মূল নির্যাস ছিল—প্রতিটি গ্রামের জন্য আলাদা আলাদা পরিবারকে বিশাল অনুভূমিক বাড়ি নির্মাণের পরিবর্তে শহরের মতো বহুতল ‘কন্ডোমিনিয়াম ধরনের আধুনিক ও পরিকল্পিত ভবন নির্মাণ করা। এই মডেলে গ্রামের বিভিন্ন পরিবার বংশপরম্পরায় একই যৌথ ও সমন্বিত অবকাঠামোয় বসবাস করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভবনগুলো উল্লম্বভাবে সম্প্রসারণ করা যাবে। কয়েকটি পরিকল্পিত সুউচ্চ ভবনেই একটি পুরো গ্রামের মানুষ বসবাস করতে পারবে। ফলে একদিকে যেমন বিস্তীর্ণ কৃষিজমি রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্যানিটেশন, ইন্টারনেট ও বিনোদনসহ স্থানীয় সরকারের মৌলিক সেবাগুলোও সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮৮ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর (প্রায় ২ কোটি ১৮ লাখ একর) আবাদযোগ্য কৃষিজমি রয়েছে, যা দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৫৯.৭ শতাংশ। অথচ বিভিন্ন গবেষণার তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর জনসংখ্যা বাড়ছে প্রায় ২২ লাখ। কৃষিজমি হ্রাসের গতিও আশঙ্কাজনক নদীভাঙন: প্রতি বছর প্রায় ৮,৭০০ হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অবকাঠামো ও আবাসন: বাসস্থান ও উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বছরে প্রায় ৩,০০০ হেক্টর জমি নষ্ট হচ্ছে। বিগত ৩৭ বছরে শুধু বসতবাড়ি নির্মাণেই ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার একর জমি। ইটভাটার প্রভাব: পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যে, দেশে বিদ্যমান প্রায় ৭,৮৮১টি ইটভাটার মধ্যে ৪,৬৩৩টি অবৈধ, যা কৃষি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৫০ হাজার একর জমি এসব ইটভাটার দখলে রয়েছে। প্রতি বছর এসব ভাটায় ইট তৈরির জন্য প্রায় ১৫ কোটি মেট্রিক টন উপরিভাগের উর্বর মাটি পুড়িয়ে নষ্ট করা হয়। এর সরাসরি প্রভাবে প্রায় ১৩,৫০০ হেক্টর জমির ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সব মিলিয়ে আবাসন ও ইটভাটার কারণে প্রতি বছর প্রায় ১৬,৫০০ হেক্টর এবং নদীভাঙনের কারণে আরও ৮,৭০০ হেক্টর—অর্থাৎ বছরে মোট প্রায় ২৫,২০০ হেক্টর আবাদি জমি চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। এটি বার্ষিক প্রায় ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি হ্রাস পাওয়ার প্রবণতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

স্থায়ী সমাধান: স্পেশাল ইকোনমিক জোন ও আধুনিক প্রযুক্তি

এই সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনার সরকার বহুমুখী ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ১. বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল : আবাদি জমি রক্ষার লক্ষ্যে সরকার বিশ্বব্যাংক ও জাইকার (JICA) সহায়তায় দেশের অনুৎপাদনশীল জমি বা চরাঞ্চলে প্রায় ৯৭টি স্পেশাল ইকোনমিক জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ অনেকদূর এগিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ৬৮টি এবং বেসরকারি ২৯টি। ২. পরিবেশবান্ধব পোড়ামাটিমুক্ত ইট: হাউস বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (HBRI) ও জাইকার যৌথ গবেষণার মাধ্যমে মাটি না পুড়িয়ে বালি ও পলিমাটি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক তৈরির প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। নদী ও উপকূলীয় এলাকায় এসব কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যা প্রচলিত মাটির ইটের একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।

৩. নদী ড্রেজিং ও ভাঙন রোধ:

আগুন ছাড়া ইট বা নির্মাণসামগ্রী তৈরির উপাদান—বালি ও পলি—সরকারি নজরদারিতে নদীর তলদেশ থেকে ড্রেজিং করে সংগ্রহ করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং ভাঙন কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে বালি ও পলিকে পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে না দেখে মূল্যবান সম্পদে পরিণত করা সম্ভব হবে।

আগামীর সম্ভাবনা

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী ১০০ বছরের জলবায়ু ও ভূখণ্ডগত ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘গ্রামীণ শহর’ গড়ে উঠতে পারে, অন্যদিকে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি ও পরিবেশও অধিকতর সুরক্ষিত হবে। গ্রামকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার আওতায় এনে কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষা—এই দুই লক্ষ্যকে সমন্বিত করাই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

লেখক: নীহারিকা রায়, উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট