রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
logo

দ্য সোর্স নিউজ বাংলা

মতামত

আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান: ইতিহাস ও ‘অপারেশন জ্যাকপট’

লিখেছেন: শুভ্র মানিক , সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১:৩৩ পিএম
আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান: ইতিহাস ও ‘অপারেশন জ্যাকপট’

লাল-সবুজের গৌরবগাথা ৫৬,৯৭৭ বর্গমাইল আয়তনবিশিষ্ট বাংলাদেশ নামের দেশটির জন্মের সাথে রবিঠাকুরের লেখা এই গানটির তাৎপর্য অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তো বটেই, বিশ্বের ইতিহাসেও সেরা নৌ-অপারেশনগুলোর একটি ছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’। মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নির্দেশেই মুক্তিযুদ্ধের নৌ-কমান্ডো সেক্টর গঠিত হয়। পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কর্মরত ১৩ জন বাঙালি সাবমেরিনার ১৯৭১ সালের মার্চে ফ্রান্সের তুলোঁ বন্দরে পিএনএস ম্যাংরোতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। ২৫ মার্চের বর্বরোচিত হামলার পর সাবমেরিনার আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরীসহ ১৩ জন সাবমেরিনার সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন। তাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেলে তারা একজন পাকিস্তানি গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে হত্যা করে ট্রেনে করে স্পেন, রোম ও সুইজারল্যান্ড হয়ে ৯ এপ্রিল আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরীসহ ৮ জন বাঙালি সাবমেরিনার দিল্লি পৌঁছান। এখানেই এম এ জি ওসমানীর সাথে তাদের দেখা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের নৌ-কমান্ডো সেক্টর (সেক্টর-১০) গঠন করা হয়। কর্নেল এম এ জি ওসমানী এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় সীমান্তবর্তী বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে বাঙালি যুবকদের বাছাই করে নৌ-কমান্ডো হিসেবে গড়ে তোলার জন্য গোপন প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হয়। যে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, নৌ-কমান্ডোদের মানসিকভাবে দৃঢ় করতে সেই পলাশীর প্রান্তরে ভাগীরথী নদীকেই অপারেশন জ্যাকপটের প্রশিক্ষণের জন্য চূড়ান্ত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের নৌ-কমান্ডোদের সেই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের পুরোভাগের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় নেভাল অফিসার কমান্ডার এন. এন. সামন্ত। তিনিই ছিলেন অপারেশন জ্যাকপটের পাণ্ডুলিপি তৈরির কারিগর। একমাত্র তিনিই নৌ-কমান্ডোদের বিষয়ে জেনারেল অরোরা এবং জেনারেল ওসমানীর কাছে প্রতিবেদন পেশ করতেন। কমান্ডার কপিল এবং লেফটেন্যান্ট দাস ছিলেন পলাশীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ইনচার্জের দায়িত্বে। পলাশীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল 'সি-২ পি'। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশের সীমান্তবর্তী নানা ক্যাম্প হতে সাঁতার জানা সুঠামদেহী ৩০০ জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে বাছাই করা হয়। প্রশিক্ষণ শুরুর আগেই বাছাইকৃত তরুণদের বলা হয়, এটি একটি আত্মঘাতী যুদ্ধ; যেকোনো মূল্যে অপারেশন সফল করতে প্রয়োজনে প্রাণ উৎসর্গও করতে হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণের শুরুতেই প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীর ছবিসহ একটি সম্মতিপত্রে সই নেওয়া হয়। যেখানে লেখা ছিল, ‘আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি, আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।’ ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন বাঙালি সাবমেরিনার যেহেতু নৌ-কমান্ডো ছিলেন না, তাই তাদেরকেও এই প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হয়। নৌ-কমান্ডোদের গোপনীয় এই প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন মোট ২০ জন ভারতীয় প্রশিক্ষক। এতটাই গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছিল যে, সেক্টর কমান্ডাররাও এই বিষয়ে জানতেন না। প্রশিক্ষণ চলাকালীন স্থানীয় সাধারণ মানুষও প্রশিক্ষণস্থলের কাছাকাছি যেতে পারত না। এমনকি প্রশিক্ষকদেরও পরিবারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করার সুযোগ ছিল না। জলে ও স্থলে—দুটি ভাগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। স্থলযুদ্ধের প্রশিক্ষণে ছিল গ্রেনেড নিক্ষেপ, এক্সপ্লোসিভ বা বিস্ফোরকের ব্যবহার, স্টেনগান ও রিভলবার চালানো এবং আন-আর্মড কমব্যাট বা খালি হাতে যুদ্ধের পারদর্শিতা ইত্যাদি। আর জলযুদ্ধের প্রশিক্ষণে থাকত বুকে ৫-৬ কেজি ওজনের পাথর বেঁধে কখনো চিত সাঁতার, কখনো ডুব সাঁতার কাটা। একই সঙ্গে পানির ওপর নাক ভাসিয়ে রেখে টানা সাঁতার কাটা, পানিতে দ্রুত সাঁতরিয়ে এবং ডুব সাঁতারের মাধ্যমে লিমপেট মাইনের ব্যবহার ও স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতারের পারদর্শিতা ইত্যাদি। এমন সব প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো খরস্রোতা পলাশীর ভাগীরথী নদীতে। সেখানে তাদের শীত ও বর্ষায় একটানা ৪৮ ঘণ্টা পানিতে থাকার অভ্যাস করানো হয়। সব মিলিয়ে তাদের দৈনন্দিন ১৬-১৭ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নিতে হতো। প্রায় টানা ৩ মাস কঠোর প্রশিক্ষণের পর অপারেশনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয় বাংলাদেশের প্রথম নৌ-কমান্ডো বাহিনী। প্রশিক্ষণার্থীদের নিজস্ব জেলা বা অঞ্চলে অপারেশনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যাতে স্থানীয় জনসাধারণের সাহায্য পাওয়া সহজ হয়; পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষা জানার কারণে পথঘাট সহজেই মানুষের কাছ থেকে জেনে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণের নানা পর্যায়ের পরীক্ষার ফলাফল অনুসারে 'A' থেকে 'H' পর্যন্ত মোট ৮টি গ্রেড করা হয়েছিল। 'A' গ্রেড পাওয়া নৌ-কমান্ডোদেরকেই পাকিস্তানি জাহাজে লিমপেট মাইন লাগানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুসারে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের পর পরই ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে বা ১৬ আগস্টের প্রথম প্রহরেই হবে অপারেশন। প্রশিক্ষণের পর আগস্ট মাসে চূড়ান্ত আক্রমণের পরিকল্পনা ঢেলে সাজানো হতে থাকে। একই সময়ে ২টি সমুদ্রবন্দর ও ২টি নদীবন্দরে আক্রমণ চালানোর জন্য ৪টি সেক্টরের পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটানো হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রথম ব্যাচকে ৪টি স্থানে আক্রমণের জন্য মোট ৪টি দলে ভাগ করা হয়েছিল— ৬০ জনের ২টি দল এবং ২০ জনের আরও ২টি দল। ৪টি দলের দলনেতাদের অপারেশন পরিচালনার জন্য শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিশেষ পদ্ধতি, যা দলের অন্যান্য সদস্যদের কাছেও গোপন ছিল। সাবমেরিনার আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ৬০ জন নৌ-কমান্ডো চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে, আমিনুর রহমান খসরুর নেতৃত্বে ২৬০ জন কমান্ডো (যার মধ্যে ৬০ জন নৌ-কমান্ডো ও ২০০ জন সি-আন্ড-সি কমান্ডো) মংলা সমুদ্রবন্দরে, সাবমেরিনার বদিউল আলমের নেতৃত্বে ২০ জন কমান্ডো চাঁদপুর নদীবন্দরে এবং সাবমেরিনার আবদুর রহমানের নেতৃত্বে ২০ জন কমান্ডো নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে আক্রমণ করবেন বলে চূড়ান্ত হয়। ঠিক করা হয় দুটি গান, যা অপারেশনের সংকেত হিসেবে প্রচার করা হবে কলকাতা আকাশবাণীর পক্ষ থেকে—পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানে (সকাল ৬:০০ থেকে ৬:৩০ মিনিট অথবা রাত ১০:৩০ থেকে রাত ১১:০০ টা)। এই ফ্রিকোয়েন্সি ও গান দুটির মরমার্থ শুধু প্রতিটি দলের কমান্ডাররাই জানতেন। প্রথম সংকেত ছিল পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত “আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান”। এর অর্থ হলো সব রকম প্রস্তুতি নিয়ে ২য় গানটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আর দ্বিতীয় সংকেত ছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া “আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি” গানটি। দ্বিতীয় সংকেত হচ্ছে সুস্পষ্ট নির্দেশ—এখন থেকে ঠিক ২৪ ঘণ্টা পরেই আক্রমণ করতে হবে। আর সে হিসেবে প্রতিটি দলের দলনেতা তাদের ‘জিরো আওয়ার’ ঠিক করে নেবেন। ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্টের প্রথম প্রহরে অবাক বিস্ময়ে বিশ্ববাসী দেখে বাঙালি যোদ্ধাদের বীরত্বগাথা। বিশ্বের বাঘা বাঘা সমরবিদদের মুখের ভাষা ক্ষণিকের জন্য থেমে যায়। কীভাবে সম্ভব এমন এক নিখুঁত ও সফল অপারেশন—একজন নৌ-কমান্ডোকেও না হারিয়ে? এমনকি যারা প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, সেই ভারতীয় নৌ-কমান্ডোরাও অবাক হয়ে যান দেশের সেই মুক্তিপাগল ছেলেগুলোর জীবন বাজি রাখা এই অপারেশন দেখে! কীভাবে সম্ভব হয়েছিল? শুধুমাত্র পায়ে ফিন্স লাগিয়ে, অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া, বুকে ৬ কেজি ওজনের লিমপেট মাইন বেঁধে খরস্রোতা নদীতে পানির ৪/৫ ফুট নিচে গিয়ে কমান্ডো ছুরি দিয়ে শ্যাওলা পরিষ্কার করে লিমপেট মাইন স্থাপন করে আবার নিরাপদে ফিরে আসা! ১৬ আগস্টের প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে পরিচালিত ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এ পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৫০ হাজার ৮০০ টনের মোট ২৬টি জাহাজ পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করেছিলেন নৌ-কমান্ডোরা। এছাড়া বহু নৌযান ধ্বংস ও অকেজো হয়ে গিয়েছিল। নৌ-কমান্ডোদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাকিস্তানি বাহিনীর ৬৬ হাজার ৪০ টনের জাহাজ। প্রকৃত অর্থেই অপারেশন জ্যাকপট ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক মরণকামড়; একই সঙ্গে নৌ-যোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতার নিদর্শন। এখনো সেই অসীম সাহসী যোদ্ধারা নিভৃতে এই গান দুটি শোনেন এবং প্রেরণা পান বলে আমি বিশ্বাস করি। আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান তার বদলে আমি চাই নে কোনো দান॥ প্রকৃত অর্থেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা কোনো প্রতিদানের আশায় যুদ্ধ করেননি। তারা শুধুমাত্র দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বলেই এমন নিখুঁত ও সফল কমান্ডো অভিযান সম্ভব হয়েছিল। বিনম্র শ্রদ্ধা, ভক্তি ও হৃদয়নিংড়ানো ভালোবাসা সকল বীরাঙ্গন ও বীরদের প্রতি। লেখক: শুভ্র মানিক , সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক